রিয়াল মাদ্রিদ এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লা লিগায় বার্সেলোনার চেয়ে ৭ পয়েন্ট পিছিয়ে তারা শিরোপা দৌড় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। চ্যাম্পিয়নস লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে তাদের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
বায়ার্নের কাছে জয়ের জন্য কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের নিজেদের সেরা সমর্থ্য প্রয়োগ করতে হবে। লিগে মায়োর্কার কাছে ২-১ গোলে হারের পর কোচ আলভারো আরবেলোয়া বলেছিলেন, “খেলোয়াড়দের বোঝানো কঠিন যে ২০০ শতাংশ না দিলে জেতা যাবে না।”
পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, রিয়াল তাদের সেরা ফুটবল খেলছে না। চলতি মৌসুমে তারা ১০ ম্যাচে হেরেছে। আরবেলোয়ার অধীনে এই সংখ্যা ১৮ ম্যাচে ৫। এই দুর্দিনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি, তারকাদের ছন্দহীনতা, লড়াকু মানসিকতার অভাব এবং বিকল্প পরিকল্পনার ব্যর্থতা সহ কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে ৫টি প্রধান কারণ নিয়ে আলোচনা করা যাক।
মৌসুমে ৩৮ গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে সাধারণত সমস্যার কারণ হন না। কিন্তু এখন তাঁকে সমাধানকারী বলে মনে হচ্ছে না। ফরাসি ফরোয়ার্ডটি সর্বশেষ গোল করেছেন ৮ ফেব্রুয়ারি। আরবেলোয়ার অধীনে এমবাপ্পেকে ছাড়াই রিয়াল টানা পাঁচ ম্যাচ জিতেছে, যার মধ্যে ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে প্রথম লেগ।
একসময় মনে হয়েছিল রিয়াল এমবাপ্পেকে ছাড়াই জয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে এবং তখনই তাদের সেরা ফুটবল দেখা গেছে। কিন্তু এখন এমবাপ্পেকে নিয়েও তারা হারছে। তাঁকে এককভাবে দোষ দেওয়া যায় না, তবে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। মায়োর্কার বিপক্ষে তিনি ছয়টি শট নিয়ে তিনটি লক্ষ্যে রেখেও গোলকিপারকে হারাতে পারেননি। দলে তাঁর জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, কিন্তু দ্রুত গোলের ধারায় ফিরতে হবে। কারণ এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস একসঙ্গে খেললে রক্ষণে ঘাটতি তৈরি হয়, যা পূরণের জন্য এমবাপ্পেকে গোল করতেই হবে।
মায়োর্কার কাছে হারের পর কোচ আরবেলোয়া বলেছেন, “দ্বিতীয়ার্ধে আমরা অনেক ভালো খেলতে পারিনি, এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে।” সেদিন দ্বিতীয়ার্ধে দুর্বলতা ছাড়াও যোগ করা সময়ে গোল হজম করতে না পেরে তারা হেরেছে। অথচ আগে রিয়াল নিয়মিত পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়াত। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে তারা প্রায়ই লড়াইয়ে ফিরত। কিন্তু আরবেলোয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর সাতবার পিছিয়ে পড়ে মাত্র দুবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এই অভ্যাস না ফেরালে বিপদ বাড়বে।
এই মৌসুমে রিয়ালের খারাপ পারফরম্যান্সের বড় কারণ ফিটনেস সমস্যা। অনেকে আঙুল তুলছেন বরখাস্ত কোচ জাবি আলোনসো এবং সাবেক ফিটনেস কোচ ইসমায়েল কামেনফোর্তের দিকে। পরে আন্তোনিও পিন্টুসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু স্বল্প সময়ে পরিবর্তন আনতে পারেননি। এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম চোট থেকে ফিরেছেন, কিন্তু রদ্রিগোর মৌসুম শেষ। থিবো কোর্তোয়া, ফেরলাঁ মেন্দি ও দানি সেবায়েস চোট নিয়ে বাইরে। এখন আর কোনো চোট না হয়, সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
গত গ্রীষ্মে রিয়াল প্রায় সাড়ে ১৯ কোটি মার্কিন ডলার খরচ করে ডিন হুইসেন, ক্যারেরাস, ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়েনা ও ট্রেন্ট আলেক্সান্দার আরনল্ডকে দলে যোগ করেছে। কিন্তু সবাই সমালোচনার মুখে পড়েছেন। হুইসেন এখন ছন্দে আছেন, তবে মায়োর্কায় হলুদ কার্ডের পর তুলে নেওয়া হয়েছে। আরনল্ড ভালো খেললেও ধারাবাহিকতা নেই। ক্যারেরাস আক্রমণে ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ৫ কোটি ইউরোর ফুল-ব্যাকে এতটা প্রত্যাশা ছিল না পূরণ। মাস্তানতুয়েনা সবচেয়ে হতাশাজনক, একাদশ হারিয়েছেন। মায়োর্কায় ৭৭ মিনিটে নেমে মাত্র ১২ বার বল স্পর্শ করেছেন, ম্যাচ প্রভাবিত করতে পারেননি। নতুন খেলোয়াড়রা না জমলে আরেক হতাশাময় মৌসুম হতে পারে।
আগে শুরুর একাদশ ব্যর্থ হলে বদলি খেলোয়াড়রা ম্যাচ ঘুরিয়ে দিত। ২০২৩-২৪ মৌসুমে হোসেলু, আন্দ্রেই লুনিন, নাচো ফার্নান্দেজ ও লুকা মদ্রিচ এভাবে সফল হয়েছিলেন। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে সবাই ভূমিকা রেখেছিল। খেলোয়াড়রা কৌশল মেনে সাফল্য এনেছিল। কিন্তু এবার দ্বিতীয় সারির খেলোয়াড়রা ছাপ রাখতে পারছে না। মায়োর্কায় ভিনিসিয়ুস-মাস্তানতুয়েনোরা বদলি হয়েও চমক দেখাতে পারেনি। আরবেলোয়ার কাছে ‘প্ল্যান বি’ নেই। দ্রুত বিকল্প পরিকল্পনা না এলে রিয়াল আরও ভুগবে।






