চলতি বছর শেয়ারবাজারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তারল্যসংকট। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক ঝুঁকি অন্যতম প্রধান কারণ। বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এ বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা শেয়ারবাজারকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে।
সম্প্রতি একটি জরিপে এমন মতামত প্রকাশ করেছেন বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউস লংকাবাংলা সিকিউরিটিস ‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট সেন্টিমেন্ট সার্ভে–২০২৬’ নামে এই জরিপ পরিচালনা করে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকাশনায় জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, চলতি বছর শেয়ারবাজারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী। উত্তরে প্রায় ৪০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এ বছর শেয়ারবাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর প্রায় ২৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তারল্যসংকট হবে এ বছর বাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৬৩ শতাংশ মনে করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তারল্যসংকট—এ দুটি বিষয় শেয়ারবাজারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই জরিপ চালানো হয়। জরিপে ১০১ জন তাঁদের মতামত জানান। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন সেবা খাত, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগ ব্যাংকার, বিদেশি বিনিয়োগকারী, শেয়ারবাজারে লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ট্রেডার বা লেনদেনকারী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। প্রশ্নোত্তরের ভিত্তিতে তারা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।
শেয়ারবাজারের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসা–বাণিজ্য ও আর্থিক খাত নিয়েও বিভিন্ন মতামত উঠে এসেছে এই জরিপে। ২০১২ সাল থেকে লংকাবাংলা সিকিউরিটিস প্রতিবছর এই জরিপ পরিচালনা করে আসছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এ বছর সার্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি কী। উত্তরে প্রায় সাড়ে ৫৬ শতাংশ বলেছেন, রাজনীতি, সুশাসন ও সামাজিক অস্থিরতা এ বছর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। আর প্রায় ২৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের অস্থিরতাকে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি মনে করছেন তাঁরা। এ কারণে জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩০ শতাংশ মনে করেন, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। আর ২৯ শতাংশ মনে করেন, অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৫ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ।
এই জরিপ শুরুর সময় দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। জরিপের শেষ দিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব হস্তান্তর হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, অর্থনীতির ওপর নির্বাচনের প্রভাব কী হবে। উত্তরে সাড়ে ৫৩ শতাংশ বলেছেন, নির্বাচনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে নির্বাচন সহায়তা করবে।
গত বছর শেয়ারবাজারে কোন বিষয় সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছিল, তা নিয়ে জরিপে জিজ্ঞাসা করা হয়। উত্তরে সাড়ে ৪৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেন, গত বছর নীতি সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কর পরিবেশ শেয়ারবাজারে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। চলতি বছর শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন খাত মুখ্য ভূমিকা পালন করবে, তা নিয়েও জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে সাড়ে ৪৬ শতাংশ বলেছেন, ব্যাংক খাত শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধির পেছনে মুখ্য ভূমিকা রাখবে। প্রায় ১৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলো এ বছর বাজারে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকায় থাকবে। ৯ শতাংশ বলেছেন, শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধিতে এ বছর মুখ্য ভূমিকায় থাকবে বিমা খাতের শেয়ার।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বছর শেষে কোথায় থাকতে পারে, এমন প্রশ্নও জরিপে ছিল। উত্তরে প্রায় ২৮ শতাংশ বলেছেন, বছর শেষে ডিএসইএক্স সূচকটি সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার পয়েন্টের মধ্যে থাকবে। আর ২৩ শতাংশ বলেছেন, বছর শেষে ডিএসইএক্স সূচকটি ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাজার পয়েন্টের মধ্যে থাকবে। অর্থাৎ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ মনে করেন, চলতি বছর শেষে ডিএসইএক্স সূচকটি সাড়ে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় হাজার পয়েন্টের মধ্যে থাকবে। আর ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, এ বছর শেয়ারবাজারের দৈনিক গড় লেনদেন ৪০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার ঘরে থাকবে। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ মনে করেন, দৈনিক গড় লেনদেন থাকবে ৪০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে। আর ৩৩ শতাংশ মনে করেন, দৈনিক গড় লেনদেন ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার মধ্যে থাকবে।






