যুদ্ধ প্রায়ই বিশ্বের গোপন বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে আমাদের সামনে তুলে ধরে। যখন পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তখনই বোঝা যায় এই বিশ্ব কীভাবে কয়েকটি সরু জলপথ এবং অদৃশ্য বাণিজ্যিক চুক্তির উপর নির্ভর করে টিকে আছে। বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে হরমুজ প্রণালী ঠিক এমনই এক জায়গায় পরিণত হয়েছে।

সাধারণ মানুষের কাছে হরমুজ প্রণালী বলতে জ্বালানি শক্তির প্রধান ধমনী বোঝায়। এই পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এবং প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়। তবে এটিকে শুধু জ্বালানি পরিবহনের উৎস মনে করলে ভুল হবে।

হরমুজ প্রণালী সার, খাদ্য এবং কৃষি সরঞ্জাম পরিবহনেরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডর। এই জলপথে পণ্য আটকে গেলে প্রভাব শুধু পেট্রলপাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ধাক্কা পড়ে শস্যবাজারে, জাহাজ ভাড়ায় এবং বিমা খরচে। চূড়ান্ত ফল পড়ে সাধারণ মানুষের খাবারের টেবিলে।

ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত অর্থনৈতিক সংকট ঘটিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা পড়ায় জ্বালানি তেলের দাম অনেকখানি বেড়েছে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সংকটের আশঙ্কায় এশিয়ার দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ছে সারের কারখানায় এবং পাকিস্তানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানির অভাবে ভারত ও জাপানের মতো দেশগুলো আবার কয়লার দিকে ঝুঁকছে।

ভয়ের মূল কথা আরও গভীর। পারস্য উপসাগরের দেশগুলো, ইরাক ও ইরান এমন ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী সার রপ্তানি ও খাদ্য আমদানির সংযোগস্থল। বিশ্বের মোট সারের এক-তৃতীয়াংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে সমুদ্রপথে যায়।

দীর্ঘদিন এই জলপথ বন্ধ থাকলে শুধু ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, সারা বিশ্বে কৃষিকাজের মৌসুম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো প্রথমে সংকটের শিকার হবে, যারা আন্তর্জাতিক সরবরাহের উপর নির্ভরশীল।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সম্প্রতি সতর্ক করেছে, গ্রীষ্মের মধ্যে সংকট সমাধান না হলে বিশ্বে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ নতুন করে ভয়াবহ খাদ্য অসুরক্ষায় পড়তে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় কৃষি দেশগুলোও এর বাইরে নয়, কারণ তারা প্রচুর সার আমদানি করে।

সারের সংকটের ভয়াবহতা ২০২১ সালে শ্রীলঙ্কা হাড়ে হাড়ে অনুভব করেছে। সেই ধাক্কা থেকে তারা এখনও পুরোপুরি মুক্ত হয়নি। মিসর ও সুদানের মতো দেশেও বর্তমান যুদ্ধ দুর্ভিক্ষের সংকেত দিচ্ছে।

তবে এই ধ্বংস থেকে রেহাইয়ের পথ এখনও খোলা। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেখা গেছে, রাশিয়া ও ইউক্রেন শত্রু হলেও জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্য পরিবহনের চুক্তি হয়।

সেই উদ্যোগ ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু জীবনরক্ষাকারী। লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের মধ্য দিয়েও খাবার ও সার নিরাপদে পৌঁছানো। এখানে বিশ্বাসের চেয়ে প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

এখন ঠিক তেমনই এক ‘হরমুজ ট্রানজিট ইনিশিয়েটিভ’ বা ট্রানজিট উদ্যোগ দরকার। এটি কোনো শান্তিচুক্তি নয়, বরং যুদ্ধের মধ্যে খাদ্য, সার ও কাঁচামালের নিরাপদ যাতায়াতের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি।

এর জন্য সব পক্ষকে বিবাদ মিটাতে হবে না। শুধু স্বীকার করতে হবে যে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে না খাইয়ে রাখা কারো লক্ষ্য নয়।

ইরান বা উপসাগরীয় দেশগুলো তেল নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেও খাদ্য-সার নিয়ে বাজি ধরা তাদের জন্য আত্মঘাতী। ইরানও প্রচুর খাবার আমদানি করে। খাদ্য নিরাপত্তা এমন ইস্যু যা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা কঠিন, এবং এটি সবার সাধারণ স্বার্থ রক্ষা করে।

এই উদ্যোগ সফল করতে জাতিসংঘের এক বিশেষ টাস্কফোর্স দরকার, যেখানে জাহাজ চলাচল, নিষেধাজ্ঞা ও আঞ্চলিক রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা যুক্ত থাকবেন। জাহাজের অবস্থান ট্র্যাকিং, পর্যবেক্ষণ ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বিমা কোম্পানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে কাজ করতে পারে।

এই প্রস্তাব মূল যুদ্ধের সমাধান নয়। সবচেয়ে ভালো হতো যদি পক্ষগুলো যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতো। কিন্তু তা আপাতত অসম্ভব মনে হলে আলোচনার এক সংক্ষিপ্ত নির্দিষ্ট পথ বেছে নিতে হবে।

কূটনীতির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এক বিপর্যয় থেকে বড় বিপর্যয়ের জন্ম রোধ করা। হরমুজ দিয়ে খাদ্য-সার পরিবহনের অনুমতি বর্তমান পরিস্থিতির যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত, যা কোটি কোটি মানুষের অন্ন জোগাতে সাহায্য করবে। অস্থির সময়ে শান্তির যাত্রা পূর্ণ সমাধান দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় সংযম দিয়ে। এ সময় জলপথ সচল রাখাটাই সবচেয়ে বড় সংযম।

  • কমফোর্ট এরো ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

    টাইমস ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত