নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নেতারা শ্রমিকের সংজ্ঞা পরিবর্তন, চাকরির অবসায়নে ক্ষতিপূরণ নিয়ে অস্পষ্টতা দূর, যৌথ দরকষাকষির প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ তহবিলের ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতি অবসানের জন্য শ্রম অধ্যাদেশ সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, তৈরি পোশাকশিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত শ্রম আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় বিকেএমইএর কার্যালয়ে রোববার বিকেলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠনের নেতারা। এখানে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি অমল পোদ্দার ও মো. রাশেদ।

সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গত নভেম্বরে শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। তার আগে গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই আইন সংশোধন চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। এতে শ্রমিকের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা, মহিলা শব্দের পরিবর্তে নারী শব্দ প্রতিস্থাপন, ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠন, প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন শ্রমিক থাকলে ভবিষ্যৎ তহবিল বাধ্যতামূলক, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে ১২০ দিন এবং বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে ১৩ দিন করার মতো বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়।

বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি ১১৭টি অধ্যাদেশ অনুমোদনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে শ্রম অধ্যাদেশও রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বিদ্যমান শ্রম আইনের কোন কোন বিষয়ে সংশোধন হবে, তা শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) সভায় ঐকমত্য হয়েছিল। পরে শ্রম অধ্যাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় পরিবর্তন করা হয়। এসব কারণে ভবিষ্যতে জটিলতা হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আমরা সেগুলো দূর করার জন্য টিসিসির বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শ্রম অধ্যাদেশ সংশোধন করে সেটিকে আইন আকারে পাস করার অনুরোধ করছি। আমরা নতুন করে কিছু চাচ্ছি না।’

তিনি বলেন, শ্রম অধ্যাদেশে শ্রমিকের সংজ্ঞায় কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু অধ্যাদেশের আরেক ধারায় বলা হয়েছে, তাঁরা শ্রমিক হিসেবে গণ্য হবেন না। এতে কর্মক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেবে। তাই শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে কর্মচারী বা কর্মকর্তা শব্দ বাদ দিতে হবে।

মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, ‘শ্রমিক নিজে চাকরি থেকে ইস্তফা দিলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অধ্যাদেশে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। টিসিসির সভায় ঐকমত্য হয়েছিল, শ্রমিকের চাকরির বয়স ৩ বছর থেকে ৫ বছর হলে ৭ দিনের মজুরি, ৫ থেকে ১০ বছর হলে ১৫ দিন এবং ১০ বছরের বেশি চাকরি হলে ৩০ দিনের মজুরি পাবেন। তবে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, শ্রমিকের চাকরির বয়স ৩ বছর হলে ৭ দিন, ৩ বছর থেকে ১০ বছরের কম হলে ১৫ দিন এবং ১০ বছর বা তার বেশি হলে ৩০ দিনের মজুরি পাবেন। আমরা টিসিসির সভায় যে ঐকমত্য হয়েছিল, সেভাবেই এখানে সংশোধন চাই।’

এছাড়া টিসিসির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কোনো কারখানায় একটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকলেও নির্বাচনের মাধ্যমে যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধি বা সিবিএ নির্বাচিত হতে হবে। সেক্ষেত্রে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেলে তা সম্ভব। কিন্তু অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, একটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে সেটিই সিবিএ হিসেবে গণ্য হবে। এমনটা হলে শিল্পকারখানায় বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে বলে মোহাম্মদ হাতেম উল্লেখ করেন। কারণ ২০-২৫ জনের একটি কমিটি পুরো প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য কিনা, তা নির্বাচন ছাড়া বলা যায় না।

ভবিষ্যৎ তহবিলের বিষয়েও অধ্যাদেশে সংশোধন দরকার বলে মোহাম্মদ হাতেম জানান। তিনি বলেন, টিসিসির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কোনো প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের জন্য পেনশন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রগতি স্কিম চালু করলে আলাদা ভবিষ্যৎ তহবিল করতে হবে না। কিন্তু অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে যারা ভবিষ্যৎ তহবিল গঠনের আবেদন করবে, তাদের জন্য সেটি করতে হবে। এক প্রতিষ্ঠানের জন্য দুই ধরনের ব্যবস্থা জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ বলে তিনি মন্তব্য করেন।