রাজশাহী নগরের বড়কুঠি এলাকার পদ্মা গার্ডেনে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা। অভিযোগকারী ছাত্রী থানায় গিয়ে হেনস্তার শিকার হন এবং পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। তবে শেষমেশ পুলিশ মামলা গ্রহণ করেছে।
মামলায় এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে স্থানীয় মনিরুজ্জামান শান্ত (৪২) ও মো. শুভকে (৩২)-কে। তিন-চারজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মনিরুজ্জামান নগরের বোয়ালিয়া থানা (পশ্চিম) স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। তাঁর ভাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় সূত্র জানায়, মনিরুজ্জামান এর আগে স্বরস্বতীপূজায় হামলার ঘটনায় একটি মামলার আসামি ছিলেন।
ছাত্রীর মামলায় বলা হয়, গত শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তিনি এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পদ্মা গার্ডেনে অনুষ্ঠিত ‘প্রথম রাজশাহী লিটারারি ফেস্টিভ্যাল-২০২৬’ দেখতে যান। অনুষ্ঠানের প্রবেশমুখের ভেতরে মোটরসাইকেল রাখা হচ্ছিল। মোটরসাইকেল রাখার টিকিট বিক্রি করছিলেন মনিরুজ্জামান ও তাঁর অনুসারীরা। এ নিয়ে ছাত্রী ও তাঁর বন্ধুর সঙ্গে তাঁদের প্রথমে কথা-কাটাকাটি হয়। তারা জিজ্ঞাসা করেন, গ্যারেজের টিকিট বিক্রি কেন হচ্ছে এবং অনুমতি আছে কি না। এ প্রশ্নে টিকিট বিক্রেতারা অকথ্য গালাগালি শুরু করে এবং ভয় দেখাতে থাকে। পরে মনিরুজ্জামান এসে ছাত্রীকে গালাগালি করেন। প্রতিবাদ করায় তিনি অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে ধর্ষণের হুমকি দেন।
মামলায় আরও বলা হয়, ছাত্রীর বন্ধু প্রতিবাদ করলে মনিরুজ্জামান ও তাঁর সঙ্গীরা দুজনকেই মারধর করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। স্থানীয় লোকজনের সাহায্যে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ঘটনার দিন রাতেই ছাত্রী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। রাতে তিনি বোয়ালিয়া মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। পুলিশ রাত ৯টার দিকে সেখানে ফোর্স পাঠায় এবং আসামিদের চিহ্নিত করতে ছাত্রীকে নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশ বিপাকে পড়ে এবং ছাত্রীকে আবার হেনস্তা করা হয়। হেনস্তার ভিডিও ধরতে গিয়ে এক সাংবাদিক মারধরের শিকার হন। রাত ১০টায় পুলিশ ছাত্রীকে থানায় বসতে বলে।
ছাত্রী অভিযোগ করেন, থানায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। ঘটনাস্থলের কিছু লোক এবং বিএনপির নেতা-কর্মীরা উপস্থিত হন। সেখানে বোয়ালিয়া থানা (পূর্ব) বিএনপির আহ্বায়ক আশরাফুল ইসলাম, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেকসহ অনেকে ছিলেন।
ছাত্রী বলেন, ‘থানায় বসে থাকার সময় আমাকে ওসির কক্ষে ডাকা হয়। সেখানে অনেক লোকজন ছিল। ওসি কিছু বলার আগেই বিএনপি নেতা আশরাফুল ইসলাম আমাকে জেরা শুরু করেন, কেন গিয়েছি, রাতে সেখানে কী কাজ, রাজনৈতিক পরিচয় কী।’
পুরো ঘটনা পুলিশের সামনেই ঘটলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে ছাত্রী দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘ওসির তখন বারবার ফোন আসছিল। তিনি তখন ফোনে ব্যস্ত ছিলেন। পরে আমাদের ডিউটি অফিসারের কক্ষে পাঠানো হয়।’ পুলিশ বারবার জিডি করার প্রস্তাব দিয়েছে এবং নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে দিয়েছে। ‘আমি বলি, মামলা না নিলে জিডি করব না।’
এই প্রতিবেদক রাতে থানায় উপস্থিত ছিলেন। তখন বিএনপি নেতা আশরাফুল ইসলাম জানান, ‘তাঁরা থানায় এসেছেন, ঘটনাটি আসলে সঠিক কি না, এটি জানার জন্য।’
রাত ১১টায় ছাত্রী থানা থেকে বের হন। পরে রোববার সংবাদ সম্মেলন ঘোষণা দেন। বিষয়টি জানাজানি হলে রোববার তাঁকে আবার থানায় ডেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নেওয়া হয়।
ছাত্রী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাকে প্রকাশ্যে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এরপর পুলিশের সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে আবার হেনস্তার শিকার হয়েছি। থানাতেও হেনস্তা হয়েছি। থানায় গিয়েও নিরাপত্তা পাইনি। উল্টো হেনস্তার শিকার হয়েছি। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
অভিযোগ নিয়ে মনিরুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনাটি অতটা গুরুতর কিছু নয়। গ্যারেজে একটি সাধারণ তর্কবিতর্কের ঘটনাকে বড় করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আমি সেখানে গিয়ে একজন ছেলেকে দু-একটি কথা বলেছি, তবে কারও সঙ্গে অশালীন আচরণ বা অভিযোগে উল্লিখিত কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেখানে মেয়েটি ছিল না। পরে পুলিশের ডাকে থানায় গিয়েছিলাম। সেখানে পুলিশ বলছিল গালিগালাজে মামলা হয় না। পরে শুনলাম আজকে মামলা হয়েছে।’
ঘটনাস্থলে জুবায়ের আলী নামে এক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘লিটারারি ফেস্টিভ্যালে নারীকে হেনস্থার ঘটনা শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে আমি ভিডিও ধারণ শুরু করি। এ সময় কয়েকজন আমার ওপর চড়াও হয়। সেখানে সোহেল নামে একজন গায়ে হাত তুলে। তারা আমার ফোন কেড়ে নিয়ে প্রায় ৩০–৪০ সেকেন্ডের ভিডিও মুছে দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি পরিচয় দেওয়ার পরও তারা আক্রমণাত্মক আচরণ করে। সেখানে উপস্থিত পুলিশও আমাকে সহযোগিতা না করে উল্টো প্রশ্ন তোলে কেন আমি তাদের না জানিয়ে ভিডিও করছিলাম। ঘটনার পর থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে চাইলে মামলা নেওয়া হয়নি, জিডি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।’
বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম মামলা নিশ্চিত করে বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে। মামলা নিতে গড়িমসির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমে যে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা মামলার উপযোগী ছিল না। পরে আমরা তদন্ত করে বিষয়টি সংশোধন করে সঠিকভাবে মামলা নিয়েছি।’ থানার পরিবেশ নিয়ে অভিযোগের প্রসঙ্গে ওসি বলেন, ‘ওই সময় থানায় অনেক লোকজন ছিল। তবে সেটি আমাদের কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। আমরা ঘটনাটি যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি।’






