যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশের আধিপত্যের লড়াইয়ে রাডার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রহরী। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো এই প্রহরীর চোখ ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলা চালাতে সক্ষম। অতীতে বিমানগুলো রাডার এড়াতে মাটির খুব কাছে দিয়ে উড়ত। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে এখন লুক-ডাউন রাডার তৈরি হয়েছে, যা মাটির কাছাকাছি বস্তুও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে। ফলে আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো এখন একাধিক স্তরের স্টেলথ বা অদৃশ্যতার প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাডারকে ছলনা করে। লকহিড মার্টিনের এফ-৩৫ মডেলের মতো পঞ্চম প্রজন্মের বিমান থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের ষষ্ঠ প্রজন্মের এফ-৪৭ বিমানগুলোকেও সর্বাধুনিক রাডারের চোখ ফাঁকি দেওয়ার উপযোগী করে গড়া হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা–বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীতে এমন কোনো বিমান নেই, যা শতভাগ অদৃশ্য। স্টেলথ প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো রাডার স্ক্রিনে বিমানটিকে এত ছোট বা অস্পষ্ট করে দেখানো, যাতে শত্রুপক্ষ সহজে তা শনাক্ত করতে না পারে। মূল লক্ষ্য শত্রুর রাডারকে বিভ্রান্ত করে আক্রমণের জন্য দরকারি সময় অর্জন করা। এফ-৩৫ বা এফ-২২ মডেলের বিমানগুলো সম্পূর্ণ স্টেলথ প্রযুক্তিযুক্ত। অন্যদিকে এফ-১৫ইএক্স বিমানের মতো বিমানে কিছু সিগনেচার রিডাকশন প্রযুক্তি থাকলেও সেগুলোকে পুরোপুরি স্টেলথ বলা যায় না।
‘ফ্লাইং আন্ডার দ্য রাডার’ প্রবাদটি একসময় সামরিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে স্নায়ুযুদ্ধের সময় পর্যন্ত এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। রাডারের সংকেত সাধারণত সরলরেখায় চলে এবং পৃথিবীর বক্রতার কারণে পাহাড় বা ভূপ্রকৃতির আড়ালে থাকা বিমান শনাক্ত করতে পারে না। স্নায়ুযুদ্ধে এক্সবি-৭০ ভ্যালকিরির মতো বিমান শব্দের চেয়ে তিন গুণ গতিতে অনেক উচ্চতায় উড়ত, যাতে শত্রুর ইন্টারসেপ্টর জেটগুলো তা শনাক্ত করতে না পারে। কিন্তু সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে উচ্চতায় উড়ার কৌশলটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে বি-১বি ল্যান্সার মডেলের মতো বোমারু বিমান তৈরি করা হয়, যা ভূপ্রকৃতি অনুসরণ করে মাটির কাছ দিয়ে উড়তে পারে। তবে আধুনিক লুক-ডাউন রাডার এবং শক্তিশালী প্রসেসিং ক্ষমতার কারণে এই কৌশল এখন আগের মতো অজেয় নয়।
আধুনিক যুদ্ধবিমান রাডার ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। রাডার সিগন্যাল যখন বিমানে আঘাত হানে এবং ফিরে আসে, তখন বিমান সহজেই শনাক্ত হয়। তাই স্টেলথ বিমানের ডানা ও বডির কোণগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে রাডার সিগন্যাল ছিটকে অন্যদিকে চলে যায়। এছাড়া বিমানের গায়ে বিশেষ প্রলেপ বা উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা রাডারের রেডিওতরঙ্গ শুষে নেয়। এটি স্পঞ্জের মতো কাজ করে, সংকেত ফিরিয়ে না দিয়ে নিজের মধ্যে শোষণ করে।
রাডার ছাড়াও ইনফ্রারেড বা তাপের মাধ্যমে বিমানের অবস্থান ধরা পড়ে। তাই শত্রুকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য আধুনিক জেটের ইঞ্জিন ভেতরের দিকে স্থাপন করা হয়, যাতে গরম বাতাস সরাসরি ধরা না পড়ে এবং তাপ বিকিরণ কম হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ষষ্ঠ প্রজন্মের এই প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধবিমান তৈরি করছে। এফ-৪৭-এর মতো বিমানে অল-অ্যাসপেক্ট স্টেলথ থাকবে, যা সামনের দিক ছাড়াও যেকোনো কোণ থেকে রাডার ফাঁকি দিতে পারবে। এসব বিমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম যুক্ত থাকবে, যা শত্রুর রাডার সংকেত জ্যাম করতে সক্ষম।
সূত্র: সিম্পল ফ্লায়িং






