পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে যুক্ত করে হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২৪ মাইল চওড়া। এই সংকীর্ণ পথ দিয়েই বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়। এছাড়া বিশ্বের খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহের প্রধান পথও এটি। ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এই প্রণালির এক বিস্ময়কর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস রয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সের অধ্যাপক মাইক সেয়ার্লের মতে, হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর সেই বিরল স্থানগুলোর একটি, যেখানে দুটি মহাদেশের সংঘর্ষের চিহ্ন খালি চোখে দেখা যায়।
প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ বছর আগে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণে ছিল আরব্য প্লেট এবং উত্তরে ইউরেশীয় প্লেট। এই দুই বিশাল ভূখণ্ডের মাঝখানে ছিল প্রাচীন টেথিস মহাসাগর। আরব্য প্লেট ক্রমাগত উত্তরে এগিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের নিচে ঢুকে যেতে শুরু করে। এই ধাক্কায় দুই প্লেটের মাঝের ভূভাগ কুঁচকে গিয়ে তৈরি হয় আজকের ইরানের দীর্ঘ জাগরোস পর্বতমালা।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক অ্যালেনের মতে, আরব্য প্লেট অনেকটা নমনীয় স্কেলের মতো। যখন এর এক প্রান্তে পাহাড়ের মতো ভারী ওজন পড়ে, তখন অন্য প্রান্ত নিচু হয়ে যায়। এই অবনমনের ফলে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির মতো নিচু জায়গা সৃষ্টি হয়েছে। আজ থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর আগে তুষারযুগের শেষে বরফ গলার সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ১০০ মিটার বেড়ে যায়। এই বাড়তি পানি একসময়ের অগভীর উপত্যকাকে বর্তমান গভীর জলপথে রূপান্তরিত করে।
আরব্য প্লেট ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষের আগে লাখ লাখ বছর ধরে সমুদ্রপৃষ্ঠের ঠিক নিচে ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে সেখানে প্রচুর জৈব পদার্থ জমা হয়, যা কালক্রমে তেল ও গ্যাসে পরিণত হয়। পরবর্তীতে মহাদেশীয় সংঘর্ষে সৃষ্ট পাথরের ভাঁজে এই তেল-গ্যাসের বিশাল ভান্ডার আটকা পড়ে, যা আজ ইরান, ইরাক ও কুয়েতের জ্বালানিসম্পদের প্রধান উৎস।
প্রণালির দক্ষিণে ওমানের মুসানদাম উপদ্বীপ ইরানের দিকে ধেয়ে আসছে। এখানকার কালো পাথরের পাহাড় ও খাঁজকাটা উপকূলরেখা পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সাধারণত সাগরতলের গভীরে থাকা পাথর এখানে ভূপৃষ্ঠে দৃশ্যমান। অধ্যাপক সেয়ার্লের মতে, এটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ওফিওলাইট কমপ্লেক্স। এছাড়া জাগরোস পর্বতমালায় মাটির গভীর থেকে উঠে আসা লবণ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হিমবাহের মতো প্রবাহিত হয়, যা এক অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্য।
ভূতাত্ত্বিক গবেষণা জানায়, মুসানদাম উপদ্বীপ এখনো উত্তরে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ, আরব্য প্লেট ইউরেশীয় প্লেটকে এখনো ধাক্কা দিচ্ছে। অধ্যাপক সেয়ার্লের মতে, এর ফলে হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। তবে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই; এটি পুরোপুরি বন্ধ হতে অন্তত ১ কোটি বছর সময় লাগবে। ততক্ষণ হরমুজ প্রণালি কেবল ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়ই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার অপরিহার্য চাবিকাঠিও থাকবে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক






