খাল ও নদীর মধ্যে ভূপ্রকৃতিগত পার্থক্য অনেক। খাল মূলত মানুষের তৈরি, এর আকার সাধারণত সরল ও সোজা। নদী প্রাকৃতিক, এর গতিপথ সর্পিল। খাল খনন নয়, নদী পুনঃখনন কেন দরকার, তা নিয়ে লিখেছেন মাহবুব সিদ্দিকী

গত শতাব্দীর ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৮০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত সারা বাংলাদেশে মৃত বা অর্ধমৃত নদীগুলোকে জাগিয়ে তোলার অভাবনীয় এক বিশাল কর্মসূচি চলেছিল। টানা তিন বছর ধরে চলা সেই নদী খননের উদ্যোগগুলো ছিল যেন ঐতিহাসিক গল্প। একটি দেশের প্রকৃতি রক্ষার জন্য এত বড় প্রচেষ্টা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।

সময়টা ছিল এমন যখন পার্শ্ববর্তী ভারত ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার শুরু করে। এছাড়া বাংলাদেশের তিনদিক থেকে আসা নদ-নদীগুলোর উৎসে ভারত বিভিন্ন কাঠামো তৈরি করে পানি টেনে নিতে থাকে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ শত শত নদী প্রয়োজনীয় জল না পেয়ে শুকিয়ে যেতে শুরু করে।

কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের পরিবেশে এর খারাপ প্রভাব পড়তে থাকে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই বিপদ উপলব্ধি করেন। নদী বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের পরামর্শ নিয়ে তিনি এককভাবে মৃত ও অর্ধমৃত নদী পুনঃখননের কাজ শুরু করেন।

কিছু ভরাট হয়ে যাওয়া মানবসৃষ্ট খাল ও খাঁড়িও সেই তালিকায় ছিল। নদী পুনঃখননের সঙ্গে বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের কাজও শুরু হয়। সারা দেশের মানুষ এই দুই মহান উদ্যোগে যোগ দেয়। এর আগে ১৯৭৭ সালে ভারতের সঙ্গে পাঁচ বছরের সফল গঙ্গা চুক্তি হয়।

১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের প্রথম কয়েক মাস পর্যন্ত এই বিশাল নদী পুনঃখনন কর্মসূচির সঙ্গে লেখকের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তিনি বলছেন, সেই অভিজ্ঞতা এখন প্রাসঙ্গিক।

সময়টা তিনি পাবনা জেলায় সরকারি দায়িত্বে ছিলেন। জিয়াউর রহমান একাধিকবার পাবনায় আসেন। পুলিশের পক্ষ থেকে লেখকের দায়িত্ব ছিল তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। এতে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, আদেশ ও মন্তব্য কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। তাঁর স্বল্প শাসনকালে তিন বছর ধরে তিনি দেশের প্রায় সর্বত্র গিয়ে পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দেন।

সিরাজগঞ্জসহ বৃহত্তর পাবনায় জিয়াউর রহমান তিনবার সফর করেন এবং প্রায় ১০টি প্রায় বিলুপ্ত নদী পুনঃখনন করে প্রবাহ ফিরিয়ে আনেন। নদীগুলোর মধ্যে ছিল প্রাচীন আত্রাই, ইছামতী ও করতোয়া। এছাড়া বাদাই, চন্দ্রাবতী, কাগেশ্বরী, মুক্তাহার, ধানবান্দী, বান্নাই ইত্যাদি। তাঁর নিরলস চেষ্টায় তিন বছরে বাংলাদেশ প্রায় ৩০০ মৃত বা অর্ধমৃত নদী ফিরে পায়।

লেখকের জানামতে, তৎকালীন বৃহত্তর পাবনায় তিন বছরে নতুন খাল খনন হয়নি। উল্লিখিত নদীগুলো পুনঃখনিত হয়। শুধু চলনবিলের কয়েকটি খাল পুনঃখনিত হয়। বিভ্রান্তি তৈরি হয় কারণ প্রশাসন ও গণমাধ্যম এটাকে ‘খাল খনন’ বলে।

নদীকে খালে রূপান্তর ঘটানো যাবে না। তাহলে দেশের ভূপ্রকৃতিগত সঠিক তথ্য থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বঞ্চিত হবে। দেশের নদ–নদীর সংখ্যা কমিয়ে খালে পরিণত করে বা সেগুলোর বিলুপ্তি ঘটিয়ে বিশেষ শ্রেণিকে অন্যায়ভাবে লাভবান করার সুযোগ তৈরি করা ঠিক হবে না। আবহমানকাল থেকে আমরা যাকে নদী বলছি, সেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে নদী বলেই স্বীকৃত। নদী মৃত বা অর্ধমৃত হোক, সেগুলোকে পুনর্জীবিত করে খাল নামে চিহ্নিত করা শুধু অযৌক্তিক নয়, অন্যায়ও বটে।

অনাদিকালের নদীগুলো দুই পারের মানুষকে সম্পদ দিয়ে এসেছে। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে অনেকের প্রবাহ ব্যাহত হয়, তলদেশ ভরাট হয়ে শুকিয়ে যায়। স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পুনঃখনন শুরু হয়। কিন্তু অনেক নদীর আসল বৈশিষ্ট্য বদলে সংকুচিত করে ফেলা হয়। ফলে প্রশস্ত নদী হারিয়ে যায়, পারে বিস্তীর্ণ জমি থেকে যায়।

খননকারী প্রকৌশলীরা নতুন প্রাণপ্রাপ্ত নদীগুলোকে খাল বলে চিহ্নিত করেন এবং কর্মসূচিকে ‘খাল খনন’ নাম দেন। ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা এতে সচেতনভাবে অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের কাছে প্রমাণ আছে যে, এগুলো খাল নয়, কখনো খাল ছিল না।

এসব নদীর ভিন্ন নাম আছে। পুনঃখননের পর তাদের নিজ নিজ নামেই চিহ্নিত করা উচিত ছিল। নদী কখনো খাল হয় না, খাল কখনো নদী হতে পারে। সুন্দরবন ছাড়া বাংলাদেশের অধিকাংশ খাল মানুষের তৈরি। পূর্বপুরুষরা প্রয়োজনে খাল খুঁড়েছেন, অনেক পরে নদী হয়েছে—এমন উদাহরণ অসংখ্য।

ফরিদপুরের ভুবনেশ্বর নদ থেকে খাল খনন করে ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দে আড়িয়াল খাঁ প্রাচীন পদ্মার সঙ্গে যুক্ত করেন। শীঘ্রই এটি নদী হয়। মাদারীপুর বিলরুট ১৯১৪ সালে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল হিসেবে শুরু হয়, পরে নদী হয়। খুলনার আতাই খাল, রাজশাহীর মুসা খান ও নন্দকূজা একসময় খাল থেকে নদী হয়েছে।

ঈশা খাঁ যুদ্ধকৌশলে চারটি ইছামতী নদী সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশে মোট ২০টি ইছামতী নদী। এ ধরনের উদাহরণ সারা দেশে অনেক। মানুষের খনন খাল কখনো নদী হয়, নদী খাল হয় না।

বাংলাদেশের প্রতিটি নদীর আলাদা সত্তা। যৌবন হারালে আমরা খনন করে পানি প্রবাহ ফিরাই। জিয়াউর রহমান এই কাজ শুরু করেন। আশ্চর্য, তৎকালীন নীতিনির্ধারক, গবেষক ও গণমাধ্যম এটাকে ‘খাল খনন’ বলেন। তিনি কিছু খাল পুনঃখনন করলেও নতুন খাল খুঁড়েননি। নদী পুনঃখননই মূল ছিল।

খাল খনন ও নদী খননের পার্থক্য? খাল মানবসৃষ্ট, সরল; নদী প্রাকৃতিক, সর্পিল। খালের পাড় ব্যক্তিগত, নদীর সরকারি খাস। খননে নদীকে সরু খাল বানানো হয়। মাটি পাড়ে ফেললে পরের বর্ষায় ভরাট হয়। নদীর আদলে খনন সম্ভব।

নদীর পাড়ের খাসজমি প্রভাবশালী লোকেরা দখল করেছে। সরকারি প্রশাসন উদ্ধার করতে পারে। সম্পূর্ণ খনন নয়, ঢালু অংশ থেকে তলদেশ খনন করলেই চলবে। মাটি ছড়িয়ে গাছ রোপণ করলে পূর্ণাঙ্গ হবে। নইলে খাল বানালে পাড়ের জমি দখল হয়ে পত্তনি পাওয়া যায়।

নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নদী রক্ষার অঙ্গীকার দিয়েছেন। শুরুতেই ভুল ধারণা ভাঙা দরকার।

নদীকে খালে রূপান্তর ঘটানো যাবে না। তাহলে দেশের ভূপ্রকৃতিগত সঠিক তথ্য থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বঞ্চিত হবে। দেশের নদ–নদীর সংখ্যা কমিয়ে খালে পরিণত করে বা সেগুলোর বিলুপ্তি ঘটিয়ে বিশেষ শ্রেণিকে অন্যায়ভাবে লাভবান করার সুযোগ তৈরি করা ঠিক হবে না। আবহমানকাল থেকে আমরা যাকে নদী বলছি, সেগুলো আন্তর্জাতিকভাবে নদী বলেই স্বীকৃত। নদী মৃত বা অর্ধমৃত হোক, সেগুলোকে পুনর্জীবিত করে খাল নামে চিহ্নিত করা শুধু অযৌক্তিক নয়, অন্যায়ও বটে।

  • মাহবুব সিদ্দিকী নদী গবেষক
  • মতামত লেখকের নিজস্ব