ফিরদৌসী কাদরীর জীবনযাত্রার শুরু ছিল একেবারে সাধারণ, মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মতোই, যেখানে বিকেলের খেলাধুলার পর পড়াশোনা করা ছিল অভ্যাস।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালের ৩১ মার্চ পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোডে এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তাঁর বাবা শামসুল হুদা চৌধুরী ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী, পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হন। মা নওশাবা খাতুন শিক্ষকতা-সংশ্লিষ্ট পরিবার থেকে। তবে তাঁর জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন নানা-নানি, বিশেষ করে নানি, যিনি নিজে স্কুলে না পড়লেও শিক্ষার গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন।

ভিকারুননিসা থেকে শুরু করে বাওয়ানী একাডেমি, তারপর হলি ক্রস কলেজ—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই তিনি ছিলেন মনোযোগী ছাত্রী, প্রায়ই শীর্ষে। তখন কি তিনি জানতেন যে একদিন বিশ্বমানের গবেষক হবেন? না। তাঁর নিজের কথায়, “আমি খুব সাধারণ মানুষ। গানবাজনা পারি না। পড়াশোনাটাই ভালো লাগত।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজিতে পড়াশোনা করেন। পরে পিএইচডি করতে যান ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুলে। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু ক্লাসরুমের চেয়ে গবেষণার বিস্তৃত জগৎ তাঁকে বেশি আকর্ষণ করত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল্যাব গড়ে তোলেন, গবেষণা চালান এবং প্রকাশনা করেন। তবু মনে হতো আরও বড় সুযোগ দরকার। এই অনুসন্ধান তাঁকে নিয়ে যায় আইসিডিডিআরবিতে।

একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’

আইসিডিডিআরবিতে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয় পোস্টডক দিয়ে। প্রথমে শিগেলা নিয়ে কাজ করেন—রক্ত আমাশয়ের জীবাণু। কিন্তু তাঁর আগ্রহ ছিল কলেরায়। একসময় প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “কোনটা নিয়ে কাজ করলে ভালো লাগবে, সেই সূত্র পাচ্ছিলাম না।”

ঠিক তখনই আসে নাটকীয় মোড়—কলেরার নতুন ধরন (Vibrio cholera O139) আবিষ্কৃত হয়। এই নতুন জীবাণু নিয়ে কাজ করে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি তৈরি করেন, যা আজও কলেরা শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়। এই মুহূর্ত থেকে তাঁর গবেষণা কলেরা, টিকা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে স্থির হয়।

বাংলাদেশে কলেরা ছিল ভয়াবহ। বিদ্যমান টিকা ছিল ব্যয়বহুল ও জটিল। ফিরদৌসী কাদরী ও তাঁর দল সহজ, সাশ্রয়ী ওরাল কলেরা টিকা নিয়ে কাজ শুরু করেন। মিরপুরে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের উপর বড় ট্রায়াল চালানো হয়। ফলাফল—দুই ডোজ টিকায় প্রায় ৬০ শতাংশ সুরক্ষা, যা কয়েক বছর স্থায়ী। পরে দেখা যায়, এক ডোজেও কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া যায়, বিশেষ করে পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে।

এই গবেষণার আরেক বড় অর্জন বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করা। আজ দেশে ‘কলভ্যাক্স’ নামে কলেরা টিকা উৎপাদিত হচ্ছে। তবে দুঃখের বিষয়, এটি এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রিকোয়ালিফিকেশন পায়নি। ফলে সরকারি বড় আকারে ব্যবহার সীমিত। এ নিয়ে তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট আক্ষেপ।

পুরস্কার ও দায়িত্ব

ফিরদৌসী কাদরী র‍্যামন ম্যাগ সাইসাই পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেছেন। তাঁর জীবনের বিশেষ মুহূর্ত ২০১২ সালে—ফ্রান্সের ‘গ্র্যান্ড প্রাইজ’ (৫ লাখ ইউরো) পাওয়া। এই অর্থ তিনি নিজের জন্য রাখেননি। পরিবারের সম্মতিতে প্রতিষ্ঠা করেন ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস (আইদেশি)—একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। আজ এখানে শতাধিক তরুণ গবেষক ক্যানসার, জেনেটিক রোগ, থ্যালাসেমিয়া নিয়ে কাজ করছেন। শুধু গবেষণা নয়, সচেতনতা তৈরি ও বিনামূল্যে পরীক্ষাও চলছে।

ফিরদৌসী কাদরী নিজেই বলেছিলেন, “শুধু ল্যাবে বসে থাকলে হবে না; মানুষের কাছে যেতে হবে।” এ বাক্যই যেন তাঁর জীবনের সারাংশ।

গবেষণা মানুষের জন্য

ফিরদৌসী কাদরীর গল্প এক বিশ্বাসের গল্প—গবেষণা শুধু জার্নালে নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনে। গেটস ফাউন্ডেশনকে এক চিঠিতে রাজি করানো থেকে লাখো মানুষের জন্য টিকার পথ তৈরি—এ যাত্রা প্রমাণ করে একাগ্রতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে গবেষণা সমাজ বদলাতে পারে।

  • আনিসুল হক, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক