মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। ফলে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য মূল জ্বালানি। চাহিদার দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ তৈরি করা যাচ্ছে না। এর ফলে গরমের আগেই লোডশেডিং শুরু হয়েছে। সরকার জ্বালানি সাশ্রয় করে এটি সহনীয় রাখার চেষ্টা করছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র জানায়, দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবারের গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। তখন প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। ঢাকা শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র বলছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবারের গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা হতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গতকাল শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট। ঢাকা শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিং বেশি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ খাতে ৪৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া শোধের চাপ এসেছে। যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি আমদানি খরচ বেড়েছে। তেল ও এলএনজি আমদানিতে এক মাসেই সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি। অর্থ মন্ত্রণালয় ভর্তুকির চাপ সামলাতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে। দ্বিগুণ দামে আমদানিতে ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে। এপ্রিল-মে মাসে চাহিদা বাড়বে। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে চাহিদা কমাতে সন্ধ্যার পর দোকান-বিপণি বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের মধ্যেও বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। দেশীয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে কয়লার সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। লোডশেডিং সহনীয় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

কয়লায় উৎপাদন কমে লোডশেডিং

ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়লা থেকে উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এপ্রিলে সর্বোচ্চ চাহিদায় পিডিবি ৭ হাজার ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। তবে কয়লার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভারতীয় গ্রিড থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট ধরা হয়েছে। গতকাল কয়লা থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদিত হয়েছে। ভারতীয় গ্রিড থেকে এসেছে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সর্বোচ্চ চাহিদায় ১ হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট আদানির কেন্দ্র থেকে আসার হিসাব। কিন্তু কারিগরি ত্রুটিতে একটি ইউনিট বন্ধ। গতকাল তারা ৭৬০ মেগাওয়াট দিয়েছে। এতে লোডশেডিং হয়েছে। কবে চালু হবে তা পিডিবি জানে না।

কয়লার সরবরাহ জটিলতায় আগামী এক সপ্তাহ লোডশেডিং থাকতে পারে। কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়লে লোডশেডিং কমে আসবে। তবে বৃষ্টি হলে বিদ্যুতের চাহিদা কমায় স্বস্তি আসতে পারে।
পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা

পিডিবি সূত্র বলছে, পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লা থেকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ দেয়। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই চীন-বাংলাদেশ যৌথ কেন্দ্র গতকাল ৯০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করেছে।

মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট কেন্দ্র কয়লার সংকটে অর্ধেক উৎপাদন করেছে গতকাল। পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের নতুন কেন্দ্রের দুটি ইউনিট কয়লার অভাবে বন্ধ। ১২ এপ্রিল একটি চালু হতে পারে।

পিডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কয়লার সরবরাহ জটিলতায় আগামী এক সপ্তাহ লোডশেডিং থাকতে পারে। কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়লে লোডশেডিং কমে আসবে। তবে বৃষ্টি হলে বিদ্যুতের চাহিদা কমায় স্বস্তি আসতে পারে।

জ্বালানি খাতের সংকট সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হয়েছে। জ্বালানি কেনার সক্ষমতা না থাকলে জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বা ভর্তুকি নয়, বরং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কমিয়ে ঘাটতি সমন্বয় করতে হবে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম

গ্যাস থেকে উৎপাদন অর্ধেকের কম

দিনে গ্যাস চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ গড়ে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ বাড়লেও পিডিবির চাহিদার তুলনায় কম।

পিডিবি বলছে, গ্রীষ্মে লোডশেডিংমুক্ত সরবরাহে দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার। সর্বোচ্চ চাহিদায় ৯০ কোটি হলে ১ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং হবে। এতে সারা দেশে গড়ে দুই ঘণ্টা কাটতি হতে পারে।

পিডিবি বলছে, গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। সর্বোচ্চ চাহিদার সময় গ্যাসের সরবরাহ ৯০ কোটি ঘনফুট হলে ১ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হবে। এতে সারা দেশে গড়ে দুই ঘণ্টার ম

পেট্রোবাংলা বলেছে, গ্যাস উৎপাদন কমছে। সর্বোচ্চ ৯৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ সম্ভব। এতে পিডিবি ৫ হাজার ২২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারবে। গ্যাসে সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, ১০৫ কোটি গ্যাস পেলে পৌনে ৬ হাজার মেগাওয়াট সম্ভব। গতকাল ৯৩ কোটি সরবরাহ হয়েছে। এমন থাকলে গ্যাস থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হবে। তেলচালিত কেন্দ্রে বাড়াতে হবে, কিন্তু বকেয়া বিলে তেল কেনায় সমস্যা।

বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২৯ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে গ্যাসচালিত প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট বসে থাকবে। ডিজেল-সৌর মিলে দেড় হাজার রাতে বন্ধ। রক্ষণাবেক্ষণে দেড় হাজার। ১৯ হাজার থেকে চাহিদা পূরণ করতে হবে। জ্বালানি না থাকলে কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই গ্রীষ্মে দিনে কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জ্বালানি খাতের সংকট সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হয়েছে। জ্বালানি কেনার সক্ষমতা না থাকলে জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বা ভর্তুকি নয়, বরং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কমিয়ে ঘাটতি সমন্বয় করতে হবে।