শেরপুরের গারো পাহাড়ের পাদদেশে মধ্যদুপুরের রোদে ঝলসে উঠছিল ঢাল। ঝরনার পানিতে হাত ভরে পিপাসা মেটাচ্ছিলেন এক নারী, পিঠে তিন মাসের শিশু বাঁধা। আলোকচিত্রী নীতিশ রায়ের ক্যামেরায় ধরা এই ক্ষণিকের দৃশ্য ‘তৃষ্ণা’ নামে বিশ্বের আলোকচিত্র ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

১৯৮২ সালে জাপানে ইউনেসকোর এশিয়ান কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ছবিটি আন্তর্জাতিক ‘ইয়াকুল্ট’ পুরস্কার জিতে। ওই বছরের ৬ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ছবিটি প্রকাশিত হয়।

নীতিশ রায় ছিলেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেন। সন্তান না থাকায় স্ত্রী লেখক ও কবি সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে শেরপুর শহরের নায়ানি বাজার মহল্লায় বাস করতেন।

‘তৃষ্ণা’ শুধু ছবি নয়, গারো পাহাড়ের মানুষের জীবনচিত্র। ৪৩ বছর পর ছবির মানুষদের খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেছে, তাদের জীবন এখনো কঠিন। ছবির নারী কুমুদিনী কোচ, বয়স ৬৬। বাড়ি ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী গান্ধীগাঁও গ্রামে, ১৭ শতক ভিটার পাহাড়ি টিলায়।

কুমুদিনী কোচ স্মৃতি তুলে বলেন, “বাপের অসুস্থতার খবর পাইয়া তিন মাসের রিতাকে পিঠে নিয়া নওকুচি বাপের বাড়ি যাইতেছিলাম। ঝরার পানিতে পিপাসা মিটাই। তখন যে নীতীশ দাদা ছবি তুলছে, বুঝিই নাই।”

ছবি পুরস্কার জিতলে লোকমুখে শোনেন কুমুদিনী। তখন লজ্জাও পান। নীতিশ রায় একবার বাড়িতে এসে সাদা-কালো ছবি দিয়ে যান, যা সময়ের সাথে হারিয়ে যায়। বয়সের ভারে চোখে এখন দেখেন না ভালো। সামান্য জমিতে চাষাবাদ আর সন্তানদের সাহায্যে নাতিদের নিয়ে সময় কাটান।

পিঠের শিশু রিতা কোচের এখন বয়স ৪৩। তার জীবনও সহজ নয়। স্বামী ভোজন কোচ ২০১৬ সালে ক্যান্সারে মারা যান। চিকিত্সায় জমিজমা বিক্রি হয়। একমাত্র ছেলে ধরনেশ্বর কোচ ১৮ বছরের।

স্বামীর মৃত্যুর পর রিতা ছেলেকে নিয়ে মায়ের বাড়ি ফিরেন। এখন বন বিভাগের জমিতে দিনচুক্তি শ্রমিক। ছেলেকে সংসারের খরচে ঢাকায় কাজে পাঠিয়েছেন। রিতা বলেন, “ছবিটা আমি কোনো দিন দেখি নাই। বড় হইয়া মায়ের মুখে গল্প শুনছি। সেই ছবি পুরস্কার পাইছে। কিছুদিন আগে একজন বাড়ি এসে এই ছবি দিয়ে গেছেন।”

২০১৭ সালে নীতিশ রায় মারা যান। স্ত্রী সন্ধ্যা রায় অসুস্থ অবস্থায় ‘তৃষ্ণা’র মূল কপি, ক্যামেরা ও সনদ সমাজসেবী রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার কাছে রাখেন। রাজিয়া পরে ক্যামেরা ও কিছু ছবি-সনদ জামালপুরের গান্ধী আশ্রম মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে দেন। ‘তৃষ্ণা’ শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতিতে সংরক্ষিত।

রাজিয়া সামাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নীতিশ রায় ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। অসুস্থ অবস্থায় তৃষ্ণা ছবির মূল কপি, সনদ ও ক্যামেরা আমার কাছে রেখে যান। পরে আমরা ছবি ও ক্যামেরা জাদুঘরে দিয়েছি। তবে তৃষ্ণা ছবিটি এখনো আমাদের কাছেই সংরক্ষিত আছে।”

সম্প্রতি সাখাওয়াত তমাল নামে একজন ‘তৃষ্ণা’ ছবি নিজের বলে দাবি করেন। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়ায়। শেরপুর জন–উদ্যোগের আহ্বায়ক ও শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ প্রতিবাদ জানিয়ে অনলাইনে নিবন্ধ লিখেছেন।

আবুল কালাম আজাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ছবিটি শেরপুরকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করেছে। নীতিশ রায়ের মতো আলোকচিত্রী না থাকলে হয়তো দৃশ্যটি তাঁরা দেখতে পেতেন না। তাঁর তোলা সংরক্ষিত ছবি নিয়ে জন–উদ্যোগের আয়োজনে ১৯ এপ্রিল শহরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রদর্শনী হবে। এতে নীতিশ রায়কে স্মরণ করা হবে। প্রদর্শনীতে ‘তৃষ্ণা’র মা-মেয়ে উপস্থিত থাকবেন।