বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের মেয়েকে নিয়ে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে যান, তা কেবল ব্যক্তিগত মুহূর্ত নয়, সাংস্কৃতিক বার্তাও বহন করে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতার এমন উদ্যোগ দর্শকদের জন্য হলে ফিরে আসার নীরব আহ্বান। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প কি এ আহ্বানে সাড়া দিতে প্রস্তুত?

এ ঘটনায় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। লেখক ও প্রকাশক সাঈদ বারী তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে হলে মুভি দেখতে গিয়েছিলেন। আমার যদ্দুর মনে পড়ে, এ রকম ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০০১-০৬ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখনো তিনি সে সময়ের দর্শকপ্রিয় একটি মুভি রিয়াজ-পূর্ণিমা অভিনীত “মনের মাঝে তুমি” দেখেছিলেন। এ ব্যাপারে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মারুফ খান কামাল ভাই আরও ভালো বলতে পারবেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ঈর্ষণীয়!’

পোস্টের মন্তব্যে মারুফ খান কামাল লিখেছেন, ‘আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ে ছিলাম। সেটা ২০০৩ সাল। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনায় “মনের মাঝে তুমি” ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল। মতিউর রহমান পানু ছিলেন পরিচালক। বাংলাদেশি প্রযোজক আব্বাস উল্লাহ্ শিকদার আমার সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর ভাই তারিকউল্লাহ্ শিকদার ছিলেন আমার অতি ঘনিষ্ঠ। এই ফিল্ম হাউসের তৈরি “বেদের মেয়ে জোস্‌না” ছবি সুপারডুপার হিট হয়েছিল। “মনের মাঝে তুমি” বক্স অফিস হিট করলে তখনকার প্রধানমন্ত্রী–পুত্র, বিএনপি নেতা তারেক রহমান হলে গিয়ে সস্ত্রীক ছবিটি দেখে মুগ্ধ হন। সে মুগ্ধতার প্রকাশ ও বাংলা ছায়াছবিকে উৎসাহিত করতে তারেক-জুবাইদা রহমান দম্পতি পূর্ণিমার উদ্দেশে লেখা একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন ওই চিত্রনায়িকার বাসায়।’

এই স্মৃতিকথা কেবল নস্টালজিয়ার নয়, বরং এক ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত। ক্ষমতাসীন নেতাদের চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ এবং হলকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ দেখায়। আজকের ঘটনা তাই বিচ্ছিন্ন নয়, এক পুনরাবৃত্তি—যদিও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন সংকটের মধ্যে।

বাস্তবতা যথেষ্ট চিন্তার খোরাক। একসময় শত শত প্রেক্ষাগৃহ ছিল এ দেশে, আজ কার্যকর হলের সংখ্যা হাতে গোনা। প্রায় ২৯টি জেলায় এখন সম্পূর্ণ হলশূন্যতা। শহরের পুরনো হলগুলো—যেমন ঢাকার গুলিস্তান, নাজ, রাজমণি, শাবিস্তান—একেবারে হারিয়ে গেছে। কেউ মার্কেট, কেউ গুদাম হয়েছে। যশোরের ‘মণিহার’ ভাঙার পরিকল্পনায়, বগুড়ার ‘মধুবন সিনেপ্লেক্স’ বন্ধ। ফলে হলে সিনেমা দেখা এখন দুর্লভ অভিজ্ঞতা।

এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। এখন সক্রিয় প্রায় ৬০টি হল। যে সিনেমা ছিল সম্মিলিত সামাজিক অভিজ্ঞতা, তা এখন ব্যক্তিগত স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ। প্রযোজনা চলছে, কিন্তু পর্যাপ্ত স্ক্রিন নেই। দর্শকরা ঘরে বসে কনটেন্ট দেখতে অভ্যস্ত। এতে পারস্পরিক সাক্ষাৎ কমেছে, সামাজিকীকরণের সুযোগ হারিয়েছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু নীতিগত প্রস্তুতি ছিল না।

চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) এই সংকটের প্রতীক। ১৯৫৭ সালে যাত্রা করা এ প্রতিষ্ঠান একসময় কেন্দ্রবিন্দু ছিল, আজ অবকাঠামোগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাদপসরণ ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায় অকার্যকর। ১৯৯৯-২০০০ সালে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সর্বোচ্চ ১১ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা রাজস্ব দিয়েছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপার্জন ৬ কোটি ২৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৫৭ টাকা, খরচ ২৩ কোটি ৯৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭৬৩ টাকা।

ভালো চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনের পোস্টপ্রোডাকশন ভারত বা অন্য দেশ থেকে করানো হচ্ছে যন্ত্রপাতি ও দক্ষতার অভাবে। চলচ্চিত্রকারীরা বলেন, সরকারের আর্থিক বরাদ্দের স্বল্পতা ছাড়াও এফডিসি দীর্ঘদিন যোগ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক পায়নি। এফডিসির উচিত পুরনো যন্ত্রপাতি মেরামত করে আধুনিক প্রযুক্তি যোগ করা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষ কর্মী নিয়োগ করা। সরকারের উচিত বিএফডিসি কমপ্লেক্স সমাপ্ত করা, স্বেচ্ছায় অবসরকামীদের জন্য ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’, ফিল্ম সিটির প্রকল্পের পরিবর্তে এফডিসি পুনরুজ্জীবিত করা।

এই ভূখণ্ডেই, পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্র একসময় স্বর্ণালি অধ্যায় অতিক্রম করেছে। প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক দর্শকসংস্কৃতি ছিল দৃঢ়, চলচ্চিত্র ছিল জনজীবনের অন্যতম প্রধান বিনোদন। ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে শুরু করে ধারাবাহিক সাফল্যে গড়ে উঠেছিল একটি আত্মবিশ্বাসী শিল্পভিত্তি। স্বাধীনতার পরও কিছুদিন সেই ধারাবাহিকতা টিকে ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তা ভেঙে পড়ে।

চলচ্চিত্র শিক্ষার্থীরা এফডিসিতে ব্যবহারিক ক্লাস করলে নতুন প্রজন্ম এফডিসিমুখী হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চলচ্চিত্র বিভাগে যন্ত্রের অভাবে ব্যবহারিকতা সম্ভব নয়। দেশে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম স্টাডিজ বা মিডিয়া বিভাগ থাকলেও অবকাঠামো, কারিগরি সুবিধা ও গবেষণা সীমিত। আধুনিক ক্যামেরা, সাউন্ড, পোস্টপ্রোডাকশনের প্রশিক্ষণ কম। ফলে তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকলেও বাস্তব দক্ষতায় পিছিয়ে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিক্ষার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বিসিটিআইয়ের নির্দিষ্ট ভবন নেই, নিয়মিত শিক্ষক নেই। প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে চলচ্চিত্র অঙ্গনের বাইরের মানুষ নিয়োগ। ক্যাম্পাস পরিকল্পনা আছে, কিন্তু দৃশ্যমান নয়।

সংকটের মধ্যেও বৈপরীত্য: আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ছে, স্বীকৃতি ও বৈদেশিক মুদ্রা আসছে। নতুন নির্মাতারা বিদেশ বা স্বল্পবাজেট প্রযোজনায় বিকল্প খুঁজছেন।

বিশ্বের অনেক দেশ চলচ্চিত্রকে শিল্প খাত ও মুদ্রা অর্জনের মাধ্যম মনে করে। দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, হলিউডে রাষ্ট্রীয় নীতি, বাজার ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়েছে। ভারত বলিউড ও আঞ্চলিক চলচ্চিত্রে বিশাল বাজার ও ডায়াসপোরার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক প্রভাব ও মুদ্রা অর্জন করছে।

এই ভূখণ্ডেই পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার চলচ্চিত্র স্বর্ণালী অধ্যায় অতিক্রম করেছে। প্রেক্ষাগৃহভিত্তিক দর্শকসংস্কৃতি দৃঢ় ছিল, ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে আত্মবিশ্বাসী ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পর কিছুদিন টিকলেও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।

এখন এক ভাঙা চক্র: হল নেই, দর্শক নেই; দর্শক নেই, বিনিয়োগ নেই; বিনিয়োগ নেই, মানসম্মত ছবি কম; ছবি না থাকায় দর্শক সরে যায়। এ চক্র ভাঙতে প্রয়োজন সমন্বিত নীতি—প্রদর্শন, প্রযোজনা, শিক্ষা ও বাজার একসঙ্গে।

প্রধানমন্ত্রীর হলে যাওয়াকে অর্থবহ করতে চলচ্চিত্রশিল্পের ভাঙা কাঠামো পুনর্গঠন দরকার। সঠিক নীতি ও বিনিয়োগে এটি অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে।

  • অনার্য মুর্শিদ লেখক, গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

    ই-মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব