জেরুজালেমের খ্রিষ্টধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থান ‘চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকার’। প্রতি বছর পাম সানডে বা খর্জূর রোববারে এখানে পুণ্যার্থীদের ভিড় জমে। কিন্তু এবার ছবিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
যিশুখ্রিষ্টের স্মৃতি জড়িত এই পবিত্র দিনে চার্চে প্রবেশের পথে ক্যাথলিক প্যাট্রিয়ার্ককেও আটকে দিয়েছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। জেরুজালেমের এই দরজা বন্ধ করা কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি ক্ষমতার চরম অহংকার এবং আধিপত্যের নির্লজ্জ প্রকাশ।
সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিখ্যাত ইতিহাসবিদ উইল ডুরান্টের একটি উক্তি তুলে ধরে নিজের শাসননীতির মূল সুর বোঝান। তাঁর উদ্ধৃতিতে ছিল চেঙ্গিস খান এবং যিশুখ্রিষ্টের তুলনায় শ্রেষ্ঠত্বের কথা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, চেঙ্গিস খানের শক্তি ও যুদ্ধের বিপরীতে যিশুর অহিংস বার্তায় কোনো অতিরিক্ত গুরুত্ব নেই। এটি শুধু তাত্ত্বিক কথা নয়, বরং এমন রাজনৈতিক দর্শনের প্রকাশ, যেখানে মমতা ও সত্যের চেয়ে পাশবিক শক্তিকেই সর্বোচ্চ স্থান দেওয়া হয়েছে।
খ্রিষ্টীয় দর্শনে যিশু কোনো বিজয়ী সেনাপতি হয়ে আসেননি; তিনি মানুষের মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিলেন। ত্রাসের রাজত্ব না গড়ে তিনি সত্য ও কল্যাণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার শেষ মুহূর্তেও প্রতিহিংসার কথা বলেননি।
ইসলামি ঐতিহ্যেও মরিয়মপুত্র ঈসা (আ.) অলৌকিক ক্ষমতাধর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবী। তিনি রোগীকে সুস্থ করতেন, মানবতার মর্যাদা রক্ষা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন। কিন্তু আজকের যুগে এই মানবিক মূল্যবোধের পরিবর্তে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় রাঙানো দম্ভ জায়গা করে নিয়েছে।
নেতানিয়াহুর বর্তমান ঔদ্ধত্য টিকে আছে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমরশক্তির পরজীবিতা করে। ক্ষমতার আস্ফালনে তিনি বড় সম্রাট হতে চাইছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর এই আগ্রাসন শেষ পর্যন্ত নৈতিক পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নিশ্চিত করছে না।
নেতানিয়াহুর ‘আদর্শিক পিতা’ হিসেবে চেঙ্গিস খানের ছায়া বারবার উঠে আসছে, যাঁর নাম ইতিহাসে বিভীষিকায় জড়িত। মোঙ্গল অভিযানগুলো শুধু রাজ্যজয় ছিল না, সুশৃঙ্খল গণহত্যা ও জাতি নির্মূলের প্রকল্প। বোখারা, সমরখন্দ ও মার্ভের মতো সমৃদ্ধ নগরী ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন চেঙ্গিস। পারস্য ইতিহাসবিদ আতা মালিক জুভায়নির বর্ণনায় সেই হাহাকার এভাবে চিত্রিত: ‘তারা এল, তারা সব গুঁড়িয়ে দিল, পুড়িয়ে মারল এবং লুটে নিয়ে বিদায় নিল।’
১২৫৮ সালে চেঙ্গিসের পৌত্র হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণ সভ্যতার ক্ষতকে আরও গভীর করেছিল। দজলা নদীর পানি পুড়ন্ত বইয়ের কালি ও মানুষের রক্তে কালো-লাল হয়ে গিয়েছিল। জোর করে অন্য জনপদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার এই পৈশাচিক আকাঙ্ক্ষা আজ ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতিতে ভিন্ন রূপে প্রতিফলিত হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর রাজনীতির ভিত্তি জেভ জাবোটিনস্কির ‘সংশোধনবাদী’ ইহুদিবাদ। ১৯২৩ সালে তাঁর ‘আয়রন ওয়াল’ প্রবন্ধে জাবোটিনস্কি লিখেছিলেন, আরবরা কখনো স্বেচ্ছায় ইসরায়েল ভূখণ্ড মেনে নেবে না; তাই অস্ত্রের লৌহপ্রাচীর তুলতে হবে যাতে তারা দমে যায়। এই দর্শনই আজকের জবরদখল ও বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসের জ্বালানি। ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ে ফিলিস্তিনিদের শিকড়চ্যুত করার রক্তাক্ত অধ্যায় শুরু হয়, যা আজ গাজায় চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।
৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের গাজা এখন বিশাল কবরস্থানে পরিণত। নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রতিদিন লাশ হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে আল-আকসা মসজিদে ইবাদতে কড়াকড়ি চলছে। অন্যদিকে শহরজুড়ে উগ্রবাদী বসতি স্থাপনকারীদের বিজয়োল্লাসে মত্ত করা হচ্ছে। এই যুদ্ধের লক্ষ্য সামরিক জয় নয়, এক জনগোষ্ঠীকে মানসিকভাবে পঙ্গু ও অস্তিত্বহীন করা—ঠিক চেঙ্গিস বা হালাকুর মতো।
বিদ্রূপের বিষয়, নেতানিয়াহু নিজেকে বর্বরতার বিরুদ্ধে ‘পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রহরী’ বলে পরিচয় দেন। কিন্তু তাঁর রণকৌশল আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বর্বর সময়গুলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ২০ বছর আগে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ইরাকে মার্কিন হামলার উসকানি দিয়েছিলেন, যার ফলে ইরাকি সভ্যতা আধুনিক তাতার বিনাশের মুখে পড়েছিল। আজ তাঁর লক্ষ্য তেহরান বা ইস্পাহানের মতো প্রাচীন নগরীতে মৃত্যু-ধ্বংস ছড়ানো।
তবে চেঙ্গিস খানের সঙ্গে নেতানিয়াহুর তুলনা করাও হয়তো অন্যায়। চেঙ্গিসের অন্তত নিজস্ব বিক্রম ও রণকৌশল ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহুর ঔদ্ধত্য টিকে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সমরশক্তির পরজীবিতায়। ক্ষমতার লোভে তিনি বড় সম্রাট হতে চান ঠিকই, কিন্তু এই আগ্রাসন শেষে নৈতিক পরাজয় ছাড়া কিছু নিশ্চিত করছে না।
● সুমাইয়া ঘানুশি ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক
মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত






