২১ মার্চ রাতে একটি বিশেষ বিমানে ইরান থেকে দেশে ফিরেছেন প্রবাসী ১৮৬ জন বাংলাদেশি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন খাজা নাসির তুসি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির পুরকৌশল বিভাগের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী শাকিল হোসেন। তেহরান থেকে আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরার রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন এই তরুণ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে বসে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল। মনে হলো বড়সড় ভূমিকম্প এসেছে। কিন্তু ক্লাসেই বসে জানতে পারলাম, তেহরানের তিনটি স্থানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। সবাই হন্যে হয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে।

খাজা নাসির তুসি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির পুরকৌশল বিভাগে পড়ি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একমাত্র বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। হল ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর অবস্থা আমার মতোই। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে বলা হলো, আতঙ্কিত না হয়ে হলে থাকতে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হলেও হল খোলা থাকবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়।

দুপুরের মধ্যে হলে ফিরলাম। চারদিকে তখনো বিস্ফোরণের শব্দ। মাথার ওপর দিয়ে মিসাইল উড়ে যাচ্ছে। লাগাতার বিস্ফোরণে মনে হচ্ছিল, ভূমিকম্প চলছে। ইরানের অধিকাংশ বহুতল ভবনের মাটির নিচে দুই থেকে তিনটি তলা থাকে। আমরা হলের শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নিলাম, বেগতিক হলে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাব।

ততক্ষণে আশপাশে ইন্টারনেট বন্ধ। বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে না। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল। দেশের বাইরে সরাসরি কল দেওয়া সম্ভব না।

তেহরানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হাতে গোনা কয়েকজন। ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সবার সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় অনেকে আমাকে ফোন করল নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। পাবনার বন্ধু আলী আমিন ইতিমধ্যে আমার হলে চলে এসেছে। আমরা দুজন তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করলাম। শনিবার ছুটির দিন ছিল, তবে দূতাবাসের কর্মকর্তারা জানালেন, জরুরি অবস্থায় কার্যক্রম চালু রেখেছেন। তেহরানের বাংলাদেশিদের নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা বা দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

আপাতত হল ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই। ইফতার শেষ করে বাড়িতে যোগাযোগ করলাম। সন্ধ্যার পর ফরিদপুরে মা-বাবার সঙ্গে কথা হলো। তাঁরা উদ্বেগ লুকিয়ে কষ্ট সহ্য করলেন। মনোবল বাড়াতে বাবা বললেন, ‘আগের যুদ্ধের (২০২৫ সালের ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ) সময়ও তো তুমি ইরানে ছিলে। ভয়ের কিছু নেই। ইনশা আল্লাহ, তোমার কিছু হবে না।’

বাবার কথায় সাহস পেলাম। কিন্তু ইরানের খবর পাচ্ছিলাম না। ইরানে রুবিকা ও বালে অ্যাপ সচল থাকায় জানলাম, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। রাত ১১টায় হইচই শুনলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর পেলাম, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত। সত্যতা নিশ্চিত করতে পারিনি। আতঙ্কে দুজন গল্প করে রাত কাটালাম। ভোরে ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থার খবর দেখে নিশ্চিত হলাম, খামেনি নিহত হয়েছেন।

পরদিন সকাল থেকে হল ফাঁকা হতে শুরু করল। সবাই নিজ দেশে বা ইরানের অন্য শহরে চলে যাচ্ছে। দূতাবাসে আবার যোগাযোগ করলাম। স্বস্তির খবর এল, তেহরান থেকে সাভেহ শহরে সরিয়ে নেওয়া হবে।

১ মার্চ রাতে আমি, আমিনসহ তেহরানের বাংলাদেশিরা সাভেহ গেলাম। সেখানে এক হোটেলে দূতাবাসের অস্থায়ী কার্যক্রম শুরু। আজারবাইজান হয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ শুরু হলো। আমি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দিলাম। ইরানে অনেক অবৈধ বাংলাদেশি আবেদন করতে শুরু করল। তাঁদের জন্য কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বেগ পড়ল।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের আইওএম-এর সহায়তায় ১৯ মার্চের মধ্যে ১৮৬ জনের ট্রাভেল পাস এল। রাতে আস্তারা সীমান্তে যাব। দুপুরের পর ৯টি বাসে রওনা দিলাম।

দূতাবাস আগেই আস্তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু মাঝরাতে পৌঁছে দেখলাম, কর্মকর্তারা নেই। ইরানের বন্দর আনজালিতে হামলার খবরে তারা পালিয়ে গেছে। সকালের আগে আজারবাইজানে প্রবেশ সম্ভব না। তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কনকনে শীতে কেউ ওয়েটিং রুমে, কেউ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটালাম।

সকাল ৮টায় কর্মকর্তারা এলেন। অবৈধ অভিবাসীদের আলাদা ফরম পূরণ করতে হলো। আমরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করলাম। আজারবাইজানিরা ইংরেজি জানে না, আজারি ভাষায় কথা বলে। আমার আজারি জানায় যোগাযোগ সহজ হলো। কাগজপত্র শেষ করে ভোর হয়ে গেল। ইফতারের পর কিছু খাইনি, মনে পড়ল না।

ভোরে আজারবাইজানে ঢুকে দেখলাম, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আজারবাইজান ও তুরস্ক দূতাবাসের কর্মকর্তারা অপেক্ষা করছেন। তারপর বাকু বিমানবন্দর। দুপুরের মধ্যে পৌঁছালাম। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ঢাকার বিশেষ ফ্লাইট রওনা দিল। ২১ মার্চ রাত পৌনে দুইটায় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাতৃভূমিতে পৌঁছালাম।

আমার বাবার ১১ ভাইবোন। ঈদে চাচা-ফুপুরা ফরিদপুরে একত্র হয়। কিন্তু আমি আসছি জেনে এক চাচা ফরিদপুরে যাননি। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ঢাকার বসুন্ধরায় ওই চাচার বাড়ি। পরদিন চাচার সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করে ফরিদপুর গেলাম। বাড়িতে পৌঁছে বাবা-মা বুকে টেনে নিলেন। তখন যেন সত্যিকারের যুদ্ধ থেকে বাড়ি ফিরলাম।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দুই মাসের জন্য ছুটি দিয়েছে। আমি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। সব ঠিক থাকলে কয়েক মাস পর স্নাতক শেষ হতো। এখন কী হবে জানি না।

অনুলিখন: জাওয়াদুল আলম