স্বাধীনতার মাসের শেষ দিনে চট্টগ্রামে ‘স্বাধীনতার বইমেলা’র উদ্বোধন—এটি যেন সময় থেকে ছিটকে আসা এক উৎসব। গত ৩১ মার্চ শুরু হওয়া এই মেলা কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই নয়, মনের পুনরুজ্জীবনের মতো একটি উপায়ও। ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও একুশের চেতনা থেকে সরে এবার এটি বৈশাখের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে, ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে বইমেলা হয়। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই রমজান শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে মেলা জমবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। ফলে এবার ঐতিহ্যবাহী ফেব্রুয়ারি মেলা হয়নি।
প্রকাশক, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বইপ্রেমীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই হতাশা দূর করতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সৃজনশীল প্রকাশকদের নিয়ে এই বইমেলার উদ্যোগ নিয়েছে। এই সময়সরণের মধ্যে লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা ও আশঙ্কা।
প্রথমে আবহাওয়ার কথা। এপ্রিলের চট্টগ্রামে তাপমাত্রা বাড়ে, গরম অস্বস্তিকর হয়, হঠাৎ ঝড়বৃষ্টির ভয় থাকে। খোলা জায়গায় ভিড়ে চলা মেলায় এই প্রতিকূলতা বড় চ্যালেঞ্জ। বিকেল থেকে রাত অবধি মেলা চললেও গরম বা কালবৈশাখী উপস্থিতি অনিশ্চিত করে। বইয়ের মতো সূক্ষ্ম পণ্যের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। আয়োজকদের ছাউনি, নিরাপত্তা—এসব ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, কিন্তু তা নেই।
তবু প্রতিকূলতার মধ্যে প্রত্যাশা আছে। এই মেলা প্রকাশকদের জন্য বড় বিপণনের সুযোগ। ঢাকার বাইরে প্রকাশনা সীমিত। মেলা পাঠকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে, নতুন বই প্রচার করে, পুরোনো বই বিক্রি করে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই মেলায় প্রকাশকরা আশা করছেন, বছরের হিসাব কিছুটা সামলে নেবে।
এই বইমেলা তাই আমাদের সামনে যে বাস্তবতা হাজির করে, তা হলো একদিকে আছে মানুষের বইপ্রীতি, সাংস্কৃতিক চর্চার আকাঙ্ক্ষা, প্রকাশকদের সংগ্রাম ও স্বপ্ন। অন্যদিকে আছে সময়ের অসামঞ্জস্য, আবহাওয়ার ঝুঁকি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
চট্টগ্রামের বইমেলার ইতিহাস দীর্ঘ না হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। আশির দশকে শহীদ মিনার, মুসলিম ইনস্টিটিউট মিলনায়তন, লালদীঘি, ডিসি পাহাড়ে বিভিন্ন সংগঠন আলাদা আলাদা মেলা করত। একসঙ্গে প্রচেষ্টা ছিল না, কখনো একাধিক জায়গায় মেলা চলত। সিটি করপোরেশনও আয়োজন করত, কিন্তু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বইবিক্রিকে ছাপিয়ে যেত, মেলা জমত না।
সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ ২০০৮ সাল থেকে আয়োজন শুরু করে। ২০১৭ সাল থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড় আকারে সবাই মিলে মেলা হয়। তখন থেকে এটি জমতে থাকে। ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই মেলা সাংস্কৃতিক পরম্পরায় পরিণত হয়। স্টেডিয়াম-সংলগ্ন কাজীর দেউড়ির জিমনেসিয়াম মাঠ, সিআরবি—এসব স্থান স্মৃতির ধারক। ফেব্রুয়ারির মেলা চট্টগ্রামের নিজস্ব পরিচয় হয়ে ওঠে। তাই এবারের সময়চ্যুতি ব্যতিক্রম।
এই ব্যতিক্রম একটি প্রশ্ন তোলে—ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারব কি? পরিস্থিতির চাপে কি ভেঙে যাবে? চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও প্রকাশকদের জন্য ভাবনার বিষয়। আগামী বছর ফেব্রুয়ারি একুশে ফিরে যাওয়া শুধু সময়ের বিষয় নয়, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন। একুশের সঙ্গে বইমেলার সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
আরেক দিক বিপণনের দুর্বলতা। প্রকাশকরা এক-দুই মেলায় নির্ভরশীল। সারা বছর বিক্রির অবকাঠামো নেই। সাহিত্যচর্চার জন্য ধারাবাহিক পাঠক-সংযোগ দরকার। সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
শহরকেন্দ্রে স্থায়ী বইয়ের আউটলেট গড়া যায়, যেখানে সারাবছর বই, আড্ডা, উন্মোচন হবে। এটি বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিনিয়োগ। প্রকাশকরা যৌথভাবে প্রশাসনের সাহায্য নিতে পারেন। জেলা প্রশাসন জায়গা বরাদ্দ দিতে পারে। প্রকাশকদের এগিয়ে আসতে হবে।
এই বইমেলা তাই আমাদের সামনে যে বাস্তবতা হাজির করে, তা হলো একদিকে আছে মানুষের বইপ্রীতি, সাংস্কৃতিক চর্চার আকাঙ্ক্ষা, প্রকাশকদের সংগ্রাম ও স্বপ্ন। অন্যদিকে আছে সময়ের অসামঞ্জস্য, আবহাওয়ার ঝুঁকি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
শেষে প্রশ্ন—এই মেলা ক্ষণিকের না সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার অংশ হবে? জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে বইমেলাকে দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা করতে হবে। চট্টগ্রামের এই উদ্যোগ সূচনা হতে পারে, যদি সঠিকভাবে এগোনো যায়।
ওমর কায়সার মুক্তকণ্ঠের চট্টগ্রাম অফিসের বার্তা সম্পাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব






