পোলট্রি খাতের খসড়া নীতিমালায় মুরগির প্যারেন্টস স্টক (পিএস) আমদানিতে শর্তারোপ করা হয়েছে। দেশে ব্রয়লার ছাড়া অন্য জাতের মুরগির পিএস উৎপাদন করতে পারে মাত্র দু–একটি প্রতিষ্ঠান। তাই এই বিধিনিষেধের কারণে হঠাৎ কোনো সমস্যা বা দুর্যোগে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ভয় দেখছেন খাতের সংশ্লিষ্টরা।
খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পিএস আমদানিতে বিধিনিষেধ থাকলে সরকারি অনুমতি পেয়ে আমদানি করেও ডিম বা মুরগি পেতে এক বছরের মতো সময় লাগবে। এতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বড় করপোরেট থেকে শুরু করে পোলট্রি ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক খামারিরা পিএস আমদানিতে কোনো বিধিনিষেধ চান না।
দেশে ব্রয়লারের পিএস উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে কাজী ফার্মস। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, পিএস আমদানিতে বিধিনিষেধ হলে দুই বছর আগে থেকে বাজারের চাহিদা নির্ধারণ করে গ্র্যান্ড প্যারেন্টস (জিপি) আমদানি করতে হবে। কারণ একটা জিপি থেকে পিএস হয়ে মুরগি বা ডিম পেতে দুই বছর লাগে। এত আগে বাজার চাহিদা অনুমান করে আমদানি বাস্তবসম্মত নয়। ফলে বাজারে সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধানের উপায় থাকবে না।
কাজী ফার্মস গ্রুপের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নতুন এই বিধিনিষেধ কার্যকর হলে ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণে আমদানির জন্য যে আগাম অনুমান করা হবে, সেটা ভুল হতে পারে। মুরগির বাজারে আগাম কোনো অনুমান করা খুব কঠিন। তাই প্যারেন্টস স্টক আমদানিতে সরকারি বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বাস্তবসম্মত নয়।”
এই উদ্যোক্তা জানান, ব্রয়লার মুরগির পিএস স্থানীয় উৎপাদন থেকে পাওয়া গেলেও লেয়ার এবং রঙিন জাতের মুরগির পিএস প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর দেশে কালার ও লেয়ার পিএস আমদানি হয়েছে ২১ লাখ পিস। এ ধরনের পিএস প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। গত বছর দেশে উৎপাদিত পিএস ছিল ৮২ লাখ, যার পুরোটাই ব্রয়লার মুরগির পিএস।
‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬’ নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, “বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য দেশে এক দিন বয়সী বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্টস স্টক আমদানি করা যাবে।”
প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) তথ্যমতে, ব্রয়লারের পিএস আমদানিনির্ভরতা ১০-১৫ শতাংশ। তবে লেয়ার এবং কালার মুরগির পিএস শতভাগ আমদানিনির্ভর। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে পিএস বা ব্রিডার্স ও হ্যাচারি খামার ৫১০টি। যেখানে ডিম দেওয়া মুরগি পালন হয়। মোট পোলট্রি খামার ২ লাখ ৫ হাজার ২৩১টি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানালেন, পিএস উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা থাকলেও স্থানীয় সক্ষমতা বাড়াতে এবং বাজার নজরদারি বাড়াতে বিধিনিষেধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “লেয়ার এবং রঙিন পিএস উৎপাদনে আমাদের আংশিক সক্ষমতা রয়েছে। তাই আমদানি বন্ধ করা হয়নি। বরং চাহিদা এবং সরবরাহ পর্যালোচনা করে আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে।” আমদানিকে নজরদারিতে আনতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
আমদানিনির্ভরতা
দেশে বর্তমানে ১৮টি তালিকাভুক্ত জিপি ফার্ম রয়েছে যারা পিএস উৎপাদন করে। তালিকায় ১৮টি থাকলেও উৎপাদন করে মূলত ৮টি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে উৎপাদনে রয়েছে মাত্র ৫টি—কাজী ফার্মস, প্যারাগন গ্রুপ, নারিশ পোলট্রি, নাহার অ্যাগ্রো এবং সিপি বাংলাদেশ। এর মধ্যে কাজী ফার্মসের চারটি জিপি ফার্ম রয়েছে ব্রয়লার পিএস উৎপাদনের জন্য।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লেয়ার এবং রঙিন মুরগির একমাত্র জিপি ফার্ম প্যারাগনের। তারাই এ ধরনের পিএস উৎপাদন করে। তবে চাহিদা বেড়ে গেলে তারাও আমদানি করে। বাকিরা আমদানি পিএস দিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করে। প্যারাগন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মসিউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এক বছর ধরে আমরা জিপি থেকে কালার পিএস উৎপাদন করছি। উৎপাদন যতটুকু হচ্ছে, তার পুরোটাই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। তাই চাহিদা বাড়লে আমাদেরও পিএস আমদানি করতে হচ্ছে।”
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতার কথা মাথায় রেখে আমদানিতে বিধিনিষেধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন খাতের ব্যবসায়ীরা। এতে একচেটিয়া বাজার তৈরির আশঙ্কা করছেন তারা। বিপিআইএর সভাপতি ও আস্থা পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারির চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে জানান, পিএস উৎপাদনকারীদের নিজস্ব বিশাল খামার রয়েছে। সংকটে তারা নিজেদের খামারের সুবিধা আগে দেখবে। অন্যরা সহজে পিএস পাবে না। অনুমতি নিয়ে আমদানিতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তাই এই বিধিনিষেধ বাস্তবসম্মত নয়।






