২৩ শতক জমি চাষ করেও সংসার চলে না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কষ্টের দিন গুনতেন আবু শাহিন মিয়া। দিনমজুরি করে কোনো লাভ হলো না। অবশেষে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পোশাক কারখানায় শ্রমিক হন। এখন নিজ গ্রামেই পোশাক কারখানা গড়ে তুলেছেন। এই কারখানায় ৩৬ জন নারী পায় কর্মসংস্থান। অনেক পরিবারের চেহারা বদলে গেছে।

জীবনের সংগ্রাম জয় করেছেন আবু শাহিন মিয়া (৩৭)। তাঁর বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা গ্রাম। দরিদ্র কৃষক বাবার সন্তান তিনি। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়। বর্তমানে কারখানার কর্মীদের বেতন, কাঁচামাল ও পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে মাসে অর্ধলাখ টাকার বেশি আয় হচ্ছে তাঁর।

অভাবের কারণে ২০০৪ সালে এসএসসি পাস করার পর শাহিনের পড়াশোনা বন্ধ হয়। এরপর অন্যের জমিতে দিনমজুরি শুরু করেন। ২০১২ সালে পাশের গ্রামতলা গ্রামের তালিম উদ্দিনের মেয়ে রুমানা খাতুনকে বিয়ে করেন। পৈতৃক ২৩ শতক জমি ও বসতভূমিতে টিনের ছোট ঘর তুলে সংসার শুরু। কিন্তু নিজের ও অন্যের জমি চাষ করেও সংসার চলত না। এর মধ্যে দুই সন্তান জন্ম নেয়।

অভাবে ঘরের ভার বইতে না পেরে প্রায় দশ বছর আগে সবকিছু ছেড়ে ঢাকায় চলে যান শাহিন। একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেন। স্ত্রীকে আরেকটি কারখানায় রেখে দেন। দুই বছর পর নিজ বাড়ি ফিরে আসেন। ২৩ শতক জমি বিক্রি করে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা পান। দুই লাখ টাকায় ১০টি সেলাই মেশিন কিনে চতরা গ্রামের পাশে ঘর ভাড়া নেন। ১০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে পোশাক তৈরি শুরু করেন। এতে তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। কারখানা বড় করতে চান কিন্তু স্বজনরা সাহায্য করেন না। পরে স্থানীয় সমবায় সমিতি থেকে ঋণের চেষ্টা করেন।

শাহিন মিয়া বলেন, সমিতি থেকে দেওয়ার কথা বলা ঋণ প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। এদিকে কারখানার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধু মজিবুর রহমান ও শফিকুল ইসলামকে তাঁর প্রচেষ্টার কথা জানান। তারা পাঁচ লাখ টাকা ধার দেন। ২০২২ সালে দুই লাখ টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে পুরোনো মেশিন কেনেন। তিনি বলেন, এখন কারখানায় মেশিনসহ ৫৫ লাখাধিক টাকার মালামাল আছে। তাঁর ছাড়া ৩৬ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। বেতন, কাঁচামাল, পরিবহন খরচ বাদে মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লাভ হয়।

সম্প্রতি কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, অর্ধশতাধিক নারী প্যান্ট-শার্ট-পাঞ্জাবি সহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি করছেন। পাশের কক্ষে পাঁচজন নারীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন শাহিন। তিনি বলেন, কারখানা বাড়িয়ে গ্রামের দরিদ্র মানুষের বেকারত্ব দূর করবেন। বললেন, ‘আর্থিক সহযোগিতা পেলে কারখানার উৎপাদন আরও বাড়ানো হবে। অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে, তাঁদের পরিবারে সচ্ছলতা আসবে—এটাই আমার স্বপ্ন।’

কারখানায় কাজ করেন স্থানীয় ভগবানপুরের শেফালী আক্তার (৩৭)। তিনি বলেন, দিনমজুর স্বামীর আয়ে পাঁচজনের সংসার চলে না। কারখানায় কাজ পেয়ে বাড়তি আয় হয়েছে। এখন স্বামী-নিজের রোজগারে সংসার ভালো চলছে। ছেলে-মেয়েকে স্কুলে পড়াচ্ছেন।

শাহিনের বন্ধু মজিবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দরিদ্রদের কল্যাণে কাজের কথা শুনে কারখানায় যান। প্রচেষ্টায় মুগ্ধ হয়ে চার বন্ধু মিলে টাকা ধার দেন। এতে উদ্যোগীটি স্বাবলম্বী হতে পারবেন ভেবে।

চতরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক বলেন, শাহিন মিয়া নিজের ভাগ্য বদলে অজপাড়ার নারীদের কর্মসংস্থান দিয়ে নতুন পথ দেখিয়েছেন।

যৌতুকের জন্য তিন বছরের মেয়েসহ তালাক নিয়ে খয়রুল বেগম চতরা গ্রামে দিনমজুর বাবার ঘরে আশ্রয় নেন। শাহিনের কারখানায় কাজ পান। এখন মাথা গুঁজার জায়গা হয়েছে। দুই বেলা পেট ভরে খান। ১০ শতক জমি কিনেছেন, এক গাভি আছে। চ্যাংড়া গ্রামের রঞ্জিনা খাতুন বলেন, ‘শাহিন বাবা, মোক সেলাই মেশিনের কাম শিখি নতুন জীবন দিছে। এলা হামরা আর না খায়া থাকি না।’