২০০৪ সালের অক্টোবরের শেষ দিন, পবিত্র রমজান মাসে রাজধানীর ৩/১ শ্যামলীর একটি গৃহকোণে অসাধারণ দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিলেন বিখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। মেঝেতে পাতা জায়নামাজে নামাজে দাঁড়িয়ে আছেন কবি আল মাহমুদ, আর ইফতারির থালা নিয়ে শয়নকক্ষের বিছানায় বসে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন কবি শামসুর রাহমান। এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরে ফেলেছিলেন ‘ক্যামেরার কবি’ নাসির আলী মামুন।

বাংলা কাব্যের এই দুই অনন্য কীর্তিকর্তা কবির আরও অনেক দুর্লভ মুহূর্ত এখন দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন নাসির আলী মামুন তাঁর ‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি’ প্রদর্শনীতে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেঁজের লা গ্যালারিতে এই দুই সপ্তাহের প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। চলবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে প্রদর্শনী।

কবি শামসুর রাহমান ও কবি আল মাহমুদের কাব্য নিয়ে কাব্যানুরাগী ও বিদগ্ধজনের মধ্যে বিপুল মুগ্ধতা রয়েছে। তবে তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতপথ নিয়ে পারস্পরিক দূরত্বের কথাও অনেকে বিভিন্নভাবে ভেবে থাকেন। এই বিষয়ে আলোকপাত করেন মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করে তিনি বলেন, ‘শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ নিজেরা নিজেদের মধ্যে যত না দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন, তার চেয়ে বেশি দূরত্ব তৈরি করেছি আমরা তাঁদের ভক্ত–অনুরাগীরা।’

আলোচনায় দুই কবির কাজের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে মতিউর রহমান বলেন, শামসুর রাহমান ঢাকা শহরে বেড়ে উঠেছেন; নগরজীবন ও নাগরিক চেতনা তাঁর কাব্যে নান্দনিকভাবে রূপ পেয়েছে। অন্যদিকে আল মাহমুদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রাম থেকে এসেছেন। গ্রামীণ প্রকৃতি ও প্রকৃতিলগ্ন মানবজীবনের মহিমা তাঁর কবিতার অবলম্বন। প্রথমদিকে তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, পরে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতায় আসক্ত হয়েছেন। অপরদিকে শামসুর রাহমান জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিকতাবাদ—এসব মতাদর্শ ধারণ করেছেন।

মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে তাঁরা দুজনই কবিতায় তাঁদের মতো করে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু আমরা কোনো বিশেষ কারণে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করে শামসুর রাহমানকে এগিয়ে রেখেছি। তাঁর প্রতি যতটা প্রশ্রয় ও পক্ষপাত করেছি, ততটা আল মাহমুদের ক্ষেত্রে করিনি।’

মতিউর রহমান আরও বলেন, এমন পক্ষপাত শিল্পকলায়ও দেখা গেছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, মোহাম্মদ কিবরিয়ার প্রতি যেমন প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে; ততটা এস এম সুলতানের প্রতি দেওয়া হয়নি। তিনি মফস্সলে থাকতেন। তাঁকে আড়াল করার চেষ্টা ছিল। এ ধরনের পক্ষপাত সার্বিক বিচারে শিল্প-সাহিত্যের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, ‘আমরা মুক্তকণ্ঠতে আরও বেশি ভিন্নমত, যুক্তিতর্কের বিষয়কে উপস্থাপন করতে চাই। শুধু শিল্প–সাহিত্য ও সৃজনশীলতার জন্যই নয়; দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্যই এই মুক্ত পরিবেশ ও পরমতসহিষ্ণুতা প্রয়োজন।’

বিশেষ অতিথি বিশিষ্ট শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, নাসির আলী মামুন দীর্ঘদিন ধরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি তুলছেন। এটা কেবল শাটার চাপা নয়। আলোকচিত্রে ব্যক্তিত্ব প্রকাশই সার্থক পোর্ট্রেট। তিনি এ ক্ষেত্রে অসাধারণ সফল।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট বলেন, বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান কবির আলোকচিত্র নিয়ে এই প্রদর্শনীতে কবিতা, সাহিত্য ও আলোকচিত্রের মধ্যে নিবিড় সংযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

নাসির আলী মামুন বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এই দুই কবির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ক্যামেরা ছিল মাধ্যম। দেশে-বাইরে, শান্তিনিকেতনে তাঁদের সঙ্গে ভ্রমণ করেছেন। দুই কবির মধ্যে কথা হতো না। ২০০৪ সালে শামসুর রাহমানের বাড়িতে আল মাহমুদকে নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়ে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করেছেন।

নাসির আলী মামুন বলেন, তাঁর কাছে আরও বহু দুর্লভ ছবি রয়েছে। এগুলো নিয়ে ‘ফটোজিয়াম’ সংগ্রহশালা করতে চান। সবার সহায়তা চেয়েছেন।

স্বাগত বক্তব্যে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক সাঁজোয়া শম্ভো বলেন, এ বছর আলোকচিত্রের ২০০ বছর পূর্ণ। এমন সময় বাংলাদেশের দুই প্রধান কবির এই ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীতে তারা আনন্দিত।

প্রদর্শনীতে ৫৮টি আলোকচিত্র রয়েছে, অধিকাংশ সাদাকালো। তরুণ থেকে বৃদ্ধ বয়সের নানা প্রতিকৃতি, পরিবারের সঙ্গে ঘরোয়া মুহূর্ত। শামসুর রাহমানের কবিতা লেখা, চুল আঁচড়ানো, ক্ষৌর প্রস্তুতি, স্ত্রীর সঙ্গে বসা, রিকশায় পুরান ঢাকা—এসব দেখা যাবে। আল মাহমুদ গ্রামে দেহাতি মানুষের সঙ্গে, মায়ের কাছে, কাব্যভাবনায় নিমগ্ন, পরিবারের সঙ্গে। দুই কবি একসঙ্গে আড্ডা, খাওয়া, করমর্দনের ছবি মনে ফিরিয়ে আনবে অনুরাগীদের। কবিরা সশরীর নেই, কাব্য অক্ষয়।