আধুনিক যুগের এক অদ্ভুত বিদ্রূপ যে, আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে সংযুক্ত সময়ে বাস করছি, কিন্তু একই সঙ্গে সবচেয়ে একাকী প্রজন্ম হয়েছি।

হাতের স্মার্টফোন আমাদের বিশ্বের প্রত্যন্ত মানুষের সঙ্গে যুক্ত করলেও, পাশের ঘরের মানুষের সঙ্গে দূরত্ব দূর করতে পারছে না।

এই নিঃসঙ্গতা এখন কবি-সাহিত্যিকদের বিষণ্ণতার বিলাস নয়, বরং একটি বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউিএইচও) সম্প্রতি একাকিত্বকে জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা ঘোষণা করেছে, যা প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতিকর। এটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি।

একাকিত্বের ভয়াবহতা বোঝার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের দীর্ঘতম গবেষণার দিকে তাকাতে হবে।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি গত ৮৫ বছর ধরে ‘স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট’ গবেষণা চালিয়ে আসছে। ১৯৩৮ সালে শুরু এই গবেষণায় তিন প্রজন্মের জীবন ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

এই গবেষণার বর্তমান পরিচালক ড. রবার্ট ওয়ালডিঙ্গার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন।

আট দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যে টাকা, ক্ষমতা বা মর্যাদার চেয়ে গভীর সামাজিক সম্পর্কই প্রধান। যত উষ্ণ সম্পর্ক, তত সুস্থ ও দীর্ঘজীবী।

গবেষণায় প্রমাণিত, একাকিত্ব মানসিক কষ্টের পাশাপাশি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

একাকিত্বের চরম পরিণতি দেখতে জাপানের ‘কোদোকুশি’ বা নিভৃতে মৃত্যুর দিকে তাকান। এখানে একা মারা যাওয়া মানুষের মৃত্যু দিনের পর দিন বা মাসের পর মাস অজানা থাকে।

জাপানে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এভাবে মারা যাচ্ছেন, অধিকাংশ সমাজবিচ্ছিন্ন। এই নিঃসঙ্গতাই জাপানে আত্মহত্যার হারকে বিশ্বের শীর্ষে রেখেছে।

জাপানের এই সংকট এখন প্রযুক্তি-নির্ভর পুঁজিবাদের বিষাক্ত ফল। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, বাংলাদেশের মতো দেশেও এ প্রবণতা ছড়াচ্ছে। পুঁজিবাদের ইঁদুরদৌড়ে যৌথ পরিবার ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ছে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আমাদের এত ব্যস্ত রাখছে যে একাকিত্বের অনুভূতিও ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু স্ক্রিন নেভলে গভীর শূন্যতা আসে।

যারা নির্জনে সাধনা করেন, তাদের কি ঝুঁকি? বিজ্ঞান বলছে, ‘লোনলিনেস’ এবং ‘সলিচিউড’ আলাদা।

বাউল, ফকির বা মরমিরা নিজের সৃজনশীল বা আধ্যাত্মিক জগতে মগ্ন থাকলে তা ‘পছন্দসই নির্জনতা’। এতে তারা একাকী বোধ করে না, বরং নিজের সত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়। বাউলদের ‘মনের মানুষ’ এক মনস্তাত্ত্বিক সংহতি, যা নিঃসঙ্গতা থেকে রক্ষা করে।

মনের মহান উদ্দেশ্য থাকলে বাহ্যিক একাকিত্ব ক্ষতিকর নয়। কিন্তু ভিড়ে বিচ্ছিন্ন বোধ করলে তা প্রাণঘাতী নিঃসঙ্গতা।

ডিজিটাল যুগে আমরা অদৃশ্য খাঁচায় বন্দী। ফেসবুক স্ক্রল, টিকটক ভিডিও, ইউটিউব অ্যালগরিদমে হাবুডুবু খাচ্ছি।

মস্তিষ্ক অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে; এটি ঠিক করে হাসব, রাগব বা বিশ্বাস করব।

এই নেশা প্রিয়জনদের থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এক ছাদে থেকেও আমরা আলাদা ডিজিটাল দ্বীপে।

একাকিত্বের মহামারি থেকে বাঁচতে ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ জরুরি।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমেদ হেলাল বর্তমান একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতাকে গভীর সংকট বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ফাবিং’ (Phubbing) সম্পর্কের জন্য বিষ।

‘ফাবিং’ ‘ফোন’ ও ‘স্নাবিং’-এর সংমিশ্রণ, ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক পরিভাষা।

ড. হেলালের মতে, পাশে বসে স্ক্রিনে আটকে থাকলে উপেক্ষার অনুভূতি জন্মায়, সম্পর্ক ঠান্ডা হয়।

এর পেছনে লাইক-কমেন্টের আকাঙ্ক্ষা বা ‘ফোমো’ (FOMO), যা মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টারকে মাদকের মতো উদ্দীপিত করে।

শিশুদের আসক্তিতে তিনি ‘কেইভ সিনড্রোম’ (Cave Syndrome) উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘ ঘরবন্দীতে সামাজিক অনীহা। এটি সামাজিক দক্ষতা কমায়, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা লোপ পায়। দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতা মেজাজ খিটখিটে করে, বিষণ্ণতা, হৃদরোগ ও ওবেসিটি বাড়ায়।

আগে ‘বায়োলজিক্যাল সলিডারিটি’ ছিল, প্রতিবেশী থেকে চিনি চাওয়া। এখন যান্ত্রিক যোগাযোগ।

ড. আহমেদ হেলাল পরিবার থেকে পরিবর্তন শুরু করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেরাম, লুডু, দাবা খেলা ফিরিয়ে আনুন।

খাবারের আগে ফোন সরানো, পরিবার নিয়ে সিনেমা, চোখে চোখ রেখে কথা বলা জরুরি।

বাস্তব মুহূর্তে জোর দিন, যেখানে হৃদয়ের টান বেশি। সরকারি প্রচারণা, গণমাধ্যমের ভূমিকা, মুভি থিয়েটার গড়ে তোলা দরকার।

অ্যালগরিদমের দুনিয়ায় না বুঁদ হয়ে পরিবার-বন্ধুর সঙ্গে সময় কাটান, শিশুদের খেলার মাঠে নিন, মুখোমুখি আড্ডা—এগুলো স্বাস্থ্যকর।

এক হাজার লাইকের চেয়ে সন্তানের হাসি বা বন্ধুর কাঁধে হাত হাজার গুণ কার্যকর।

জীবনকে নিজের ‘অ্যালগরিদমে’ চালান—সহমর্মিতা, সরাসরি যোগাযোগ, প্রকৃতির সঙ্গে। প্রযুক্তির জোয়ারে না ভেসে মানুষের পৃথিবীতে ফিরুন। কোনো রোবট বা এআই নয়, মানুষই একাকিত্ব মুছে দিতে পারে। সুস্থ দীর্ঘজীবনের জন্য মানবিক সংযোগের বিকল্প নেই।

  • কৌশিক আহমেদ লেখক ও সাংবাদিক