১৭৯৩ সালের অক্টোবরে সদ্য গঠিত ফরাসি প্রজাতন্ত্র বিশ্বব্যাপী সময় গণনার পদ্ধতি বদলে দেওয়ার একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা শুরু করে। তারা ঠিক করেছিল, এক দিন ২৪ ঘণ্টার বদলে ১০ ঘণ্টা হবে, প্রতি ঘণ্টা ১০০ দশমিক মিনিটে এবং প্রতি মিনিট ১০০ দশমিক সেকেন্ডে বিভক্ত হবে। এই দশমিক সময় ব্যবস্থা ছিল তাদের বিপ্লবী ক্যালেন্ডারের অংশ, যার উদ্দেশ্য ছিল সময়কে যুক্তিসঙ্গত ও অধর্মীয় করে তোলা। সপ্তাহকেও তারা ১০ দিনের করে দিয়েছিল। কিন্তু এই উদ্যোগ এক বছরেরও বেশি চলে নি। লন্ডনের রয়্যাল মিউজিয়াম গ্রিনিচের কর্মকর্তা ফিন বারেজ বলেন, "পুরোনো ঘড়িকে সেই নতুন নিয়মে রূপান্তর করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।" এছাড়া ১০ দিন পরপর ছুটি পড়ায় সাধারণ মানুষ এই ব্যবস্থাকে ঘৃণা করতে থাকে।
অনেকের মনে প্রশ্ন ওঠে, কেন আমরা আজও ৫ হাজার বছর আগের অযৌক্তিক ৬০ মিনিটের নিয়মে আবদ্ধ? এর উত্তর প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার ধূলিময় মাটির ট্যাবলেটে লুকিয়ে আছে। আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে বর্তমান ইরাকের মেসোপটেমিয়ায় সুমেরীয়রা বিশ্বের প্রথম শহর গড়ে তোলে এবং লিখনপদ্ধতি আবিষ্কার করে। তাদের গণিত ছিল সেক্সাজেসিমাল বা ৬০-ভিত্তিক। এক হাতের আঙুলের গাঁট (বৃদ্ধাঙ্গুলি বাদে) গোনলে ১২টি পাওয়া যায়। অন্য হাতের ৫টি আঙুল দিয়ে এগুলো চিহ্নিত করলে ৬০ পর্যন্ত গোনা যায়। এই পদ্ধতি থেকেই সুমেরীয়রা ১০-এর বদলে ৬০-কে গণনার ভিত্তি করে নেয়।
নিউ ব্রান্সউইক ইউনিভার্সিটির কিউনিফর্ম বিশেষজ্ঞ মার্টিন উইলিস মনরো বলেন, শহরের কৃষিকাজ, ট্যাক্স হিসাব রাখতে তারা মাটির ট্যাবলেটে এই সংখ্যা খোদাই করত। ৬০-এর বিশাল সুবিধা হলো এটি ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১০, ১২, ১৫, ২০ ও ৩০ দিয়ে নিঃশেষে বিভাজ্য। ১০-এর তুলনায় এই বিভাজ্যতা প্রাচীন হিসাবকারীদের জন্য ছিল অত্যন্ত উপকারী।
সুমেরীয়রা ৬০-কে ভিত্তি দিলেও দিনকে ২৪ ঘণ্টায় ভাগ করার কৃতিত্ব প্রাচীন মিসরীয়দের। প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী রিতা গৌচির মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের ধর্মগ্রন্থে প্রথম ঘণ্টার উল্লেখ পাওয়া যায়। মিসরীয়রা রাতকে ১২ ভাগে ভাগ করত, যা কফিনের অভ্যন্তরীণ নক্ষত্রঘড়ি থেকে জানা যায়। সম্ভবত আকাশের ১২ নক্ষত্রপুঞ্জ বা হাতের গাঁট গণনা থেকে এই ১২ এসেছে। পরে দিন-রাত মিলে ২৪ ঘণ্টার ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ নাগাদ মিসরে সূর্যঘড়ি ও জলঘড়ি প্রচলিত হয়।
ব্যাবিলনীয়রা সুমেরীয়দের কাছ থেকে ৬০-ভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করে। তারা সূর্য-চন্দ্রের গতিতে ৩৬০ দিনের ক্যালেন্ডার তৈরি করে, যা ৬০×৬-এর সঙ্গে মিলে যায়। জ্যোতির্বিদ্যার হিসাব নিখুঁত করতে তারা দিনকে ১২টি বেরুতে (দুই ঘণ্টা করে) ভাগ করে। প্রতি বেরু ৬০ উশে এবং প্রতি উশ ৬০ নিন্দাতে বিভক্ত করত। এই ৬০-ভিত্তিক উপবিভাগ থেকেই আজকের মিনিট ও সেকেন্ডের উৎপত্তি।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে আলেকজান্দ্রিয়া বিজ্ঞানের কেন্দ্র হলে গ্রিকরা ব্যাবিলনীয়দের সময়পদ্ধতি গ্রহণ করে। এতে নতুন তথ্য যোগ করা সহজ হয়। সময়ের সঙ্গে ঘড়ির নির্ভুলতা বাড়ে। ১২ শতকে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কৃত হয়, ১৮ শতকে মিনিটের কাঁটা সাধারণত্বে আসে এবং ২০ শতকে পারমাণবিক ঘড়ি বিলিয়ন বছরেও এক সেকেন্ড হারায় না।
আজ স্মার্টফোন থেকে জিপিএস—সবই এই সেকেন্ডের ওপর নির্ভরশীল। সেকেন্ডের ছোট ইউনিটে দশমিক (মিলি বা মাইক্রোসেকেন্ড) ব্যবহার করলেও ঘণ্টা-মিনিটে প্রাচীন সুমেরীয়-ব্যাবিলনীয় পদ্ধতি অটুট। ফরাসি বিপ্লবীরা বদলাতে চাইলেও ব্যর্থ হয়, কারণ এটি সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। এই উত্তরাধিকার আধুনিক বিজ্ঞানের শিখরেও আমাদের ৫ হাজার বছর আগের মেসোপটেমিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
সূত্র: বিবিসি






