কুলাউড়া শহরের পাশে সিআরপি রেস্টহাউস থেকে ভোরবেলায় রওনা দিয়ে হাকালুকি হাওরে পৌঁছালাম। এই হাওরের প্রায় সব বিলই আমার পরিচিত। হাওয়াবন্যা, কালাপানি, দুধাই, চোকিয়া, উজান-তরুল, লরিবাঈ, তল্লার বিল, চেনাউড়া, পিংলা, চেল্লা, নাগাঁও-ধুলিয়া, মালাম, ফুয়ালা, পলোভাঙ্গা, হাওর খাল, কইর-কণা, কুকুরডুবি, বালিজুড়ি, কাটুয়া বিল—এসব নাম শুনলেই চোখে ভাসে শীতকালীন জলচর পাখির ঝাঁক। এখানে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে।

প্রায় এক ঘণ্টার যাত্রায় চেনাউড়া বিলের মুখে পৌঁছে গেলাম। চারপাশ সবুজে ঢাকা। কচি ইরি ধানে ভরেছে হাওরের অনেক অংশ। মাঝে মাঝে জলজ ঘাসবন দেখা যায়। রাস্তার দু'পাশে দূর্বাঘাসের কার্পেট বিছানো। সকালের রোদে টেলিস্কোপ চোখে লাগিয়ে অসাধারণ দৃশ্য দেখলাম—প্রায় ৫০০ খয়রা কাস্তেচরা পাখির বিশাল দল। চেনাউড়া বিলে পাখির ভিড়। খয়রা চখাচখির সঙ্গে তিনটি মেটে রাজহাঁস দেখে চমকে উঠলাম। এই বিলে এই পাখির দেখা সত্যিই বিরল। সুইডিশ পাখি দেখিয়ে বন্ধু জ্যান-এরিক নিলসেন তাঁর টেলিস্কোপে চোখ রেখে বললেন, “১৯৪টি মেটে রাজহাঁস আছে। এতগুলো হাঁস একসঙ্গে পেয়ে যাব ভাবিনি।” তিনি আরও একটি হাঁস দেখলেন—বড় ধলাকপাল রাজহাঁস। আগে হাকালুকিতে এর দেখা পাওয়া যায়নি। তবে ছবি তোলা হয়নি। এই এক বিলেই ২১ প্রজাতির প্রায় ৬ হাজার পাখি দেখা গেছে।

দুই দশক ধরে হাকালুকি হাওরে পাখিশুমারিতে অংশ নিচ্ছি। চেনাউড়ায় আগেও এসেছি, কিন্তু এত ভালো পাখি কখনো পাইনি। পরে পিংলা বিলে গিয়ে ১২ প্রজাতির প্রায় ৫ হাজার পাখি দেখলাম। বেশিরভাগ শামুকখোল—দেশি জলচর পাখি। ইদানীং হাওরে এদের সংখ্যা বাড়ছে।

দুই দিনে হাকালুকি হাওরের প্রায় ৪৩টি বিলে পাখি জরিপ করলাম। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্যরা মূলত এই কাজ করেছেন, নবপল্লব প্রকল্পের কর্মীরা সহযোগিতা দিয়েছেন। দুই দলে ভাগ হয়ে প্রতিদিন ১০-১২টি বিল জরিপ করেছে। এক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইনাম আল হক, অন্য দলে আমার সঙ্গে ছিলেন আরও পাঁচজন।

আমার দলের সেরা মুহূর্ত ছিল হাওর খাল বিলে। হাকালুকির সবচেয়ে বড় এই বিলে প্রায় ২০ হাজার পাখি দেখেছি। চোখের আড়ালে পাখির ভিড়। বেশিরভাগ শামুকখোল, পানকৌড়ি, বক পরিবারের। বিরল সৈকত পাখি কালালেজ জৌরালি ছিল প্রায় তিন হাজার। এত সংখ্যায় এর দেখা বাংলাদেশের খুব কম জায়গায় মেলে। উত্তুরে টিটিও দেখা গেছে।

জলচর পাখিশুমারিতে সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী হাঁস দেখা যায়। এবার ১৮ প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস পেয়েছি। সবচেয়ে বেশি উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস—প্রায় সাড়ে চার হাজার। অন্যান্য: লালমাথা ভূতিহাস, মরচেরং ভূতিহাঁস, পিয়ং হাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, টিকি হাঁস। দুই প্রজাতির দেশি বুনো হাঁসও পেয়েছি—দেশি মেটে হাঁস এক জোড়া, বালিহাঁস প্রায় ১০৯টি।

এবার হাকালুকিতে ৫৩ প্রজাতির প্রায় ৫৪ হাজার জলচর পাখি দেখা গেছে। এর মধ্যে ৩৫ প্রজাতি পরিযায়ী, ১৮ প্রজাতি দেশি। গত বছর ছিল ৩৭ হাজার। এবার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।

যত পাখি দেখা গেছে, তার চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি আবাসস্থল এখানে আছে। পাখিশিকারির কারণে পাখি কমেছে। হাঁসের খামার ও গোচরণভূমি বেড়েছে। হাকালুকিতে প্রায় ২৭৬টি বিল, বেশিরভাগ সরকারি লিজে দেওয়া—মূলত মাছ ধরার জন্য। এবার যে সংখ্যায় পাখি পেয়েছি, তার ৯৫ শতাংশ মাত্র পাঁচটি বিলে। ১০-১৫টি বিল সংরক্ষণ করলেই পাখি ও মাছ—সবই বাড়বে।