গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে, কিন্তু রাজস্ব আহরণে সেই অনুপাতিক অগ্রগতি ঘটেনি। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় আকারের বিনিয়োগ হয়েছে।
সাম্প্রতিক হিসাবে দেশের মোট জিডিপি প্রায় ৪৬২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে জাতীয় বাজেট প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাজেট–জিডিপি অনুপাত ১৩ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে রাজস্ব–জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ থেকে ৯ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, অনেক নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশের তুলনায়ও কম। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ১২ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে এবং উন্নত দেশগুলোতে এই হার ৩০ শতাংশের বেশি। এই বাস্তবতা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় এবং তা দ্রুত সংস্কার জরুরি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুসারে, ভ্যাট মোট কর রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ অবদান রাখে। কিন্তু ভ্যাট ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ভ্যাট গ্যাপ বা সম্ভাব্য ভ্যাট ও বাস্তব সংগ্রহের পার্থক্য ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার ভ্যাটের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ টাকা আদায় হয় না। এই ঘাটতি পূরণ হলে বাজেট–ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন বাড়ানো সম্ভব হবে।
ভ্যাট ফাঁকির প্রধান কারণ ইনভয়েস ব্যবস্থার দুর্বলতা। দেশে বিপুল লেনদেন নগদভিত্তিক হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ইনভয়েসই ইস্যু হয় না। কখনো বিক্রয় কম দেখানো হয় বা ভুয়া ইনভয়েস তৈরি করে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট নেওয়া হয়। ফলে প্রকৃত লেনদেন যাচাই করা কঠিন। এই পরিস্থিতিতে ইনভয়েসিং আধুনিকীকরণ ছাড়া ভ্যাট ফাঁকি রোধ অসম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে ইনভয়েস অটোমেশন বা ই–ইনভয়েসিং গুরুত্বপূর্ণ সমাধান। এতে প্রতিটি বিক্রয় লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় সার্ভারে নিবন্ধিত হয় এবং তাৎক্ষণিক কর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। প্রতিটি ইনভয়েস ইউনিক নম্বর পায় এবং যাচাইযোগ্য হয়। ফলে লেনদেন গোপন রাখা বা ভুয়া ইনভয়েস তৈরি কঠিন হয়।
ইনভয়েস অটোমেশন কীভাবে কাজ করে
একজন ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করলে পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন বা সফটওয়্যার থেকে ডিজিটাল ইনভয়েস তৈরি হয়। এটি সরাসরি কেন্দ্রীয় সার্ভারে যায়, যাচাইকৃত আইডি পায়। ক্রেতাও ডিজিটাল বা প্রিন্টেড কপি পান। পুরো প্রক্রিয়া কয়েক সেকেন্ডে শেষ হয়, মানবীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই। ফলে জালিয়াতি অনেক কমে।
দেশে দেশে ভ্যাট বেড়েছে
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ব্যবস্থা সফল। ব্রাজিল ২০০৬ সালে ই–ইনভয়েসিং চালুর পর ভ্যাট রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং ফাঁকি কমেছে। মেক্সিকোতে ২০১১ থেকে ২০১৬ সালে কর–জিডিপি অনুপাত ১২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং ভ্যাট রাজস্ব ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ইতালিতে ২০১৯ সালে বাধ্যতামূলক ই–ইনভয়েসিংয়ের পর ভ্যাট গ্যাপ প্রায় সাত বিলিয়ন ইউরো কমে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে প্রযুক্তিনির্ভর ইনভয়েসিং রাজস্বে গেমচেঞ্জার।
বাংলাদেশে সম্ভাবনা বেশি কেন
বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা অত্যধিক। প্রাথমিক হিসাবে ভ্যাট ফাঁকি ৪০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামালে বছরে অতিরিক্ত ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কয়েক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়বে।
বাস্তবায়নের জন্য সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ দরকার। প্রথমে বড় করদাতা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পাইলট প্রকল্প চালু করে প্রযুক্তি, স্থায়িত্ব ও প্রতিক্রিয়া যাচাই করা যাবে। দ্বিতীয় ধাপে মাঝারি ব্যবসায় সম্প্রসারণ করে প্রশিক্ষণ–সহায়তা দেওয়া। তৃতীয় ধাপে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও খুচরায় মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার।
বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় হবে কেন্দ্রীয় সার্ভার, সফটওয়্যার, সাইবার নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় এক–দুই বছরে অতিরিক্ত রাজস্ব এটি উঠিয়ে দেবে। বাংলাদেশে ব্যয় কয়েক শ কোটি টাকার মধ্যে, যা সম্ভাব্য রাজস্বের তুলনায় সামান্য।
এআইয়ের ব্যবহার কীভাবে হবে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এই ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেবে। এআই লেনদেনের প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে সন্দেহজনক কার্যক্রম চিহ্নিত করবে। যেমন, হঠাৎ বিক্রয় কম দেখালে বা ভুয়া ইনভয়েসে ইনপুট ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টায় এআই তাৎক্ষণিক শনাক্ত করবে। রিস্ক প্রোফাইলিং করে অডিট পরিচালনা সম্ভব।
এআই কর প্রশাসনকে স্মার্ট করবে, মানবসম্পদের চাপ কমাবে, সিদ্ধান্ত দ্রুত করবে এবং দুর্নীতি হ্রাস পাবে। বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস অর্থনৈতিক খাতের প্রবণতা বিশ্লেষণে সাহায্য করবে।
সফলতার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যবসায়ী সহযোগিতা জরুরি। আইনগত সংস্কার, সচেতনতা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে সমান গুরুত্ব। ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে যে এটি তাদের উপকারী, সমান প্রতিযোগিতা, ডিরেগুলেশন ও খরচ হ্রাস ঘটাবে।
বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে শক্তিশালী রাজস্ব ভিত্তি গড়ছে। ইনভয়েস অটোমেশন শুধু প্রযুক্তি নয়, কৌশলগত সংস্কার যা আয়কর, হিসাব ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলবে। সঠিক বাস্তবায়নে এটি রাজস্বে নীরব বিপ্লব ঘটাতে পারে এবং অর্থনীতিকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও টেকসই করবে।
অতএব, সাহসী সিদ্ধান্তের সময় এসেছে। ইনভয়েস অটোমেশনকেন্দ্রিক আধুনিক ভ্যাট ব্যবস্থা গড়লে বাংলাদেশ রাজস্ব ও অর্থনৈতিক শাসনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারবে।
লেখক: মো. আবদুর রউফ, সাবেক সদস্য, এনবিআর ও বর্তমান চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরাম।






