এক মাস ধরে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক বহুমুখী সংঘাত চলছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি আমাদের সামনে এক মৌলিক প্রশ্ন উপস্থাপন করেছে: ইরান এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই লড়াইয়ে আসলে কে জিতবে?

আজকের যুগে কোনো যুদ্ধে কি পুরোপুরি জয় বা পরাজয় সম্ভব? নাকি জয়-পরাজয় এখন শুধু আপেক্ষিক, যা যুদ্ধরত রাষ্ট্রগুলোর লক্ষ্য অর্জনের মাত্রার উপর নির্ভর করে?

পৃথিবীর ইতিহাসে বহু বড় যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু এখনকার সংঘাতগুলো আগের থেকে অনেক আলাদা। অতীতে যুদ্ধের ফলাফল সহজেই নির্ধারণ করা যেত—সামরিক সাফল্যের ভিত্তিতে জয় বা পরাজয় ঘোষণা হতো।

কিন্তু আজকের বিশ্বরাজনীতিতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সরল বিভাজন আর কাজ করে না। এখন সামরিক সাফল্য সবসময় রাজনৈতিক জয়ে পরিণত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সামরিকভাবে এগিয়েও কৌশলগতভাবে এক রাষ্ট্র ব্যর্থ হতে পারে। সামরিক পরাজয়ের চেয়ে এই কৌশলগত ব্যর্থতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে ঠিক এই সমীকরণ স্পষ্ট। যেকোনো সামরিক জয়ের চেয়ে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বের জ্বালানির ২০ থেকে ২৫ ভাগ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে যায়। জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ ছাড়া আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি থমকে যায়।

তাই এই সংঘাতে কে জিতবে—এই সরল প্রশ্ন আর যথেষ্ট নয়। প্রশ্নের গভীরতা বাড়াতে হবে। এই ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কি শুধু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, নৌক্ষমতা বা সম্ভাব্য পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে চায়? নাকি তাদের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত?

তারা কি ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে চায়, নাকি মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারই মূল উদ্দেশ্য? আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা তাত্ত্বিক কাঠামো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতাবাদ তত্ত্ব এই চলমান যুদ্ধকে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করে। এই তত্ত্বমতে, যুদ্ধের ফলাফল কেবল সাময়িক সামরিক জয়ে নির্ধারিত হয় না। এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার ভারসাম্য, কৌশলগত প্রভাব এবং যুদ্ধোত্তর দর-কষাকষির উপর নির্ভর করে। সংঘাতের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস এবং শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এগুলো কি ইরানের সরকারপতন ঘটাবে, তা অনিশ্চিত। উল্টে এই আক্রমণ ইরানের জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়েছে এবং তাদের একতা বাড়িয়েছে। সার্বিকভাবে মনে হয় না, অচিরে ইরান সরকার পড়বে।

তাহলে এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ কী? নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও কৌশলবিদ থমাস শেলিংয়ের বল প্রয়োগ তত্ত্ব এখানে সহায়ক। গেম থিওরি দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, যুদ্ধ কেবল অস্ত্রের প্রদর্শন নয়, বরং চলমান দর-কষাকষি। এখানে লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে নির্দিষ্ট কাজ থেকে বিরত রাখা। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরাতে সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক অবরোধ ব্যবহার করছে।

ইরানও হাত গুটোয়নি করেনি। হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিয়ে এবং প্রবাহ আংশিক ব্যাহত করে বিশ্বে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে সংঘাত সামরিক পর্যায় ছাড়িয়ে দর-কষাকষির ময়দানে পৌঁছেছে, যেখানে সবাই নিজের অবস্থান মজবুত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জন মিয়ারশাইমারের আক্রমণাত্মক বাস্তবতাবাদ দিয়ে বিশ্লেষণযোগ্য। তাঁর মতে, রাষ্ট্রগুলো প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে নিজেদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে চায়। এখানে জয়-পরাজয় একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৌশলগত প্রভাব অক্ষত। আধুনিক যুদ্ধে সামরিক ও রাজনৈতিক সাফল্য আলাদা পথে চলে।

এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ ইতিহাসে কি কারও একক বিজয় হিসেবে স্থান পাবে, নাকি অমীমাংসিত শক্তির একটি দীর্ঘস্থায়ী লড়াই হয়ে থেকে যাবে, তার উত্তর তোলা রইল সময়ের হাতে। আর এর ওপরই নির্ভর করছে আগামীর মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতার পথে পা বাড়াবে, নাকি সেখানে অশান্তির আগুন অনির্দিষ্টকালের জন্য জ্বলতেই থাকবে।

এখানে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির এক ধ্রুপদি রূপ দেখা যায়, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থান অর্থনৈতিক ও দর-কষাকষির শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সামরিকভাবে পিছিয়েও ইরান হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি করে দর-কষাকষি নিয়ন্ত্রণ করেছে। জ্বালানিবাজারের অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধি তার সাফল্য প্রমাণ করে।

রবার্ট কিওহান ও জোসেফ নাইয়ের ‘জটিল আন্তনির্ভরশীলতা’ তত্ত্ব এখানে বাস্তবায়িত হচ্ছে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল অস্ত্রে নয়, বৈশ্বিক নির্ভরশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রভাবের উপর নির্ভর করে। থমাস শেলিংয়ের দর্শনমতে, ক্ষতি করার ক্ষমতাই দর-কষাকষির চাবিকাঠি। ইরান ভয়াবহ ক্ষতির হুমকি দিয়ে আলোচনায় অপরিহার্য হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগাম আঘাত ডেল কোপল্যান্ডের তত্ত্বের সাথে মিলে যায়—ভবিষ্যতের শক্তিশালী রাষ্ট্রকে পঙ্গু করা।

তবে কার্ল ফন ক্লজউইজের তত্ত্ব সীমাবদ্ধতা দেখায়। তিনি যুদ্ধকে রাজনীতির ধারাবাহিকতা বলেছেন। সামরিক অভিযান তখনই সফল, যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয়। ইরান যদি জ্বালানিবাজার অস্থিতিশীল করে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অর্জন রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হবে। উল্টো যদি তারা হরমুজ সুরক্ষিত রাখে ও ইরান অবরুদ্ধ করে, তবেই তাদের কৌশলগত বিজয় হবে।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি দেখায়, জয়-পরাজয় স্থির নয়। সামরিক প্রতাপ, অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয়েই ফলাফল নির্ধারিত হয়। হরমুজ প্রণালীতে যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তার জয়ের সম্ভাবনা বেশি।

এই দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ ইতিহাসে কি কারও একক বিজয় হিসেবে স্থান পাবে, নাকি অমীমাংসিত শক্তির একটি দীর্ঘস্থায়ী লড়াই হয়ে থেকে যাবে, তার উত্তর তোলা রইল সময়ের হাতে। আর এর ওপরই নির্ভর করছে আগামীর মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতার পথে পা বাড়াবে, নাকি সেখানে অশান্তির আগুন অনির্দিষ্টকালের জন্য জ্বলতেই থাকবে।

  • সানজিদা বারী ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডক্টরাল ফেলো হিসেবে অধ্যয়নরত। ই-মেইল: [email protected]
    *মতামত লেখকের নিজস্ব