যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করে পাকিস্তান এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এই ভূমিকা সংঘাত মেটানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হলেও বড় ঝুঁকির সম্মুখীন করতে পারে। কারণ আক্রমণকারী ও আক্রান্ত পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা সর্বদা জটিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, আলোচনায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু ইরান তা অস্বীকার করে বলেছে, কোনো আলোচনা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব এবং ইরানের ৫ দফা অবস্থানের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে, যা মিলিয়ে নেওয়া কঠিন। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলোকে ‘অতিরিক্ত’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এগুলো আত্মসমর্পণের শর্তের মতো। ইরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতি সত্ত্বেও তারা তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাসও করে না।
ইরান যুদ্ধে পাকিস্তান: সাম্প্রদায়িকতা ও দেশপ্রেমের মুখোশ। এখন পর্যন্ত পাকিস্তান খুব সতর্কতার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু যুদ্ধের বিস্তৃতির সঙ্গে এই ভারসাম্য ধরে রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। ট্রাম্প প্রশাসন ও তেহরান—দুই পক্ষের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক থাকায় পাকিস্তান বার্তাবাহক হিসেবে কিছুটা সফল হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে তারা কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে কি না। বিশেষ করে সংঘাত বাড়লে দুই পক্ষকে আলোচনায় বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রভাব বা চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা পাকিস্তানের আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। যুদ্ধ বাড়ার সঙ্গে পাকিস্তানের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
একদিকে পাকিস্তান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছে। অন্যদিকে তারা প্রকাশ্যে ট্রাম্প প্রশাসনকে সমর্থন দিয়েছে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষাচুক্তি রয়েছে। সৌদি আরব ইতিমধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
এসব কারণে পাকিস্তানের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধের প্রধান চালিকাশক্তি ইসরায়েলের ভূমিকাও যুক্ত। ইসরায়েলের ডানপন্থী সরকার শান্তি আলোচনায় আগ্রহী নয় এবং লেবাননে সামরিক অভিযান বাড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, “এই যুদ্ধে তারা ‘অর্ধেক লক্ষ্য’ অর্জন করেছে।” এ থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধ শেষের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার যখন ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈঠক আয়োজনের আশা প্রকাশ করেন, তার কয়েক দফা পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানের ইসফাহানে একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় ‘বাংকার-বাস্টার’ বোমা হামলা চালায়। এতে বোঝা যায়, পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের এই ঘোষণা এসেছিল পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকের পর। সেখানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইরানের ওপর সাম্প্রতিক হামলা ট্রাম্পের শান্তি আলোচনার ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের নেতা যদি যুদ্ধ ও শান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একই সঙ্গে বিপরীতধর্মী কথা বলেন, তাহলে তাঁকে কীভাবে বোঝা যাবে? ট্রাম্প একদিকে বলছেন তিনি শান্তিচুক্তির কাছাকাছি, অন্যদিকে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছেন এবং স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে বিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছে। তিনি হয়তো যুদ্ধ থেকে বের হতে চান, কিন্তু বাস্তবে তা তাঁর জন্য খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহ পার হলেও ইরান আত্মসমর্পণের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
ইরান যুদ্ধে পাকিস্তান কেন উভয়সংকটে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, তথাকথিত শান্তি আলোচনা আসলে একটি আড়াল হতে পারে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করেছে। এত সব ঘটনার পর প্রশ্ন ওঠে—এ ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার মধ্যে পাকিস্তান কি সত্যিই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? এই ঝুঁকিগুলো বোঝা খুব জরুরি, বিশেষ করে যখন পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।
জাহিদ হুসাইন পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ডন থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ






