দেশের ৩৯টি ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোর অর্থায়নে কাজ শুরু করেছে ‘বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’ (বিএসআইসি)। ৬০০ কোটি টাকা মূলধন নিয়ে গঠিত এই কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন শীর্ষ পাঁচ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা এমডি। কৌশলগত পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হয়েছে গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইট ক্যাসেল পার্টনার্স।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তরুণ উদ্যোক্তাদের নতুন ও সম্ভাবনাময় স্টার্টআপগুলোকে সফল করতে প্রথমে পুঁজি সরবরাহ করবে কোম্পানিটি। এছাড়া বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে পরবর্তী পর্যায়ের ‘কো-ইনভেস্টমেন্ট’ বা যৌথ বিনিয়োগ দেশে আনতে সহায়তা করবে। বিএসআইসি ৩০ এপ্রিল যাত্রা শুরু করবে এবং জুনের মধ্যে কয়েকটি উদ্যোগে পুঁজি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিএসআইসি গঠনের প্রক্রিয়া
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোর মুনাফার ১ শতাংশ দিয়ে গঠিত হয়েছে বিএসআইসির তহবিল। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে নিবন্ধন লাভ করে কোম্পানিটি। এরপর ৩৯টি ব্যাংক ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছরের মুনাফার ১ শতাংশ মূলধন হিসেবে দিতে শুরু করে।
কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে ৯ সদস্য রয়েছেন—৫ জন বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি এবং ৪ জন স্বতন্ত্র পরিচালক। প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), সোনালী ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের এমডি। ভারপ্রাপ্ত সিইও নিযুক্ত হয়েছেন প্রাইম ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) নাজিম এ চৌধুরী। তবে পূর্ণাঙ্গ সিইও হিসেবে আন্তর্জাতিক স্টার্টআপ খাতের অভিজ্ঞ পেশাদার খোঁজা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হলেও প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
* বিশেষায়িত কোম্পানিটির নাম বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি বা বিএসআইসি।
* প্রতিবছর ৩৯ ব্যাংকের মুনাফার ১% যাবে এই কোম্পানিতে।
* কোম্পানিটির পর্ষদে পাঁচ শীর্ষ ব্যাংকের এমডি
* পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত আছে লাইট ক্যাসেল পার্টনার্স
বিএসআইসির চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিএসআইসি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মতো। শুধু পুঁজির জোগান নয়, নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ দিয়ে ব্যবসাটিকে সফল করতে সহায়তা করা হবে। সাধারণত স্টার্টআপের ৯০ শতাংশ উদ্যোগই সফল হয় না। তবে ১০ শতাংশ উদ্যোগ সফল হলে ও একটি-দুটি বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়লে সেটাই হবে আমাদের সফলতা। অন্য দেশ কীভাবে স্টার্টআপগুলোকে পুঁজি দিচ্ছে, আমরা তা পর্যালোচনা করছি। স্টার্টআপগুলোকে পুঁজি দিতে বিশ্বের সর্বোত্তম সুশাসন-চর্চা অনুসরণ করব আমরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর চান পুঁজি অর্থায়নের ক্ষেত্রে গ্রামবাংলার উন্নয়নকে যেন গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমরা সেই চেষ্টা করব।’
লক্ষ্যমাত্রা
প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনী উদ্যোগে পুঁজি জোগান বিএসআইসির প্রধান লক্ষ্য। শুরুতেই পুঁজি দেওয়া হবে না, বরং কিছুটা বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখলে বিনিয়োগ করা হবে। দফায় দফায় বিনিয়োগ করে উদ্যোগ বড় করবে এবং অংশীদার হবে। ভালো করলে বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে অন্তত ৩টি স্টার্টআপে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে ৮-১২টি উদ্যোগে পুঁজি দেওয়ার লক্ষ্য। ২০২৯ সালের পর সফল উদ্যোগের শেয়ার শেয়ারবাজারে বা সরাসরি বিক্রি করা হবে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিএসআইসি হবে একটি পূর্ণাঙ্গ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মতো। শুধু পুঁজির জোগান নয়, নিয়মিত তদারকি ও পরামর্শ দিয়ে ব্যবসাটিকে সফল করতে সহায়তা করা হবে।মাসরুর আরেফিন, এমডি, সিটি ব্যাংক ও চেয়ারম্যান, বিএসআইসি
মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘অর্থায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হবে স্বাস্থ্য খাত, কৃষি, শিক্ষা, খুচরা সেবা, গ্রামীণ অর্থনীতি, যোগাযোগ, ভ্রমণ, লজিস্টিকস, খাদ্যপণ্য ইত্যাদি খাতের উদ্যোগকে। শুরুতেই আমরা কোনো প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করব না। কার্যক্রম শুরুর পর যেসব উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় মনে হবে, সেগুলোতে বিনিয়োগ করা হবে। বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পেশাদারির ভিত্তিতে কোনো তদবির বা সুপারিশে নয়।’
কোন ব্যাংক কত অবদান
৩৯টি ব্যাংক তহবিল সরবরাহ করছে বিএসআইসিতে। মুনাফা বেশি ব্যাংকের অবদান ও শেয়ার বেশি। প্রতিবছর মুনাফার ১ শতাংশ বা প্রায় ২০০ কোটি টাকা যুক্ত হবে তহবিলে। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকের ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ, সিটি ব্যাংকের ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, পূবালী ব্যাংকের সাড়ে ৬ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকের ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ ও প্রাইম ব্যাংকের ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। বাকি ৩২টি ব্যাংকও কিছু মালিকানা নিয়ে যুক্ত।
নতুন স্টার্টআপ কোম্পানি গঠনের উদ্যোগটি একটা ভালো উদ্যোগ। বর্তমানে স্টার্টআপের জন্য বিদেশ থেকে পুঁজি আনা দুরূহ। ব্যাংকের তহবিল দিয়ে ২০০-৩০০ স্টার্টআপে পুঁজি জোগান দেওয়া যাবে।ফাহিম মাসরুর, সাবেক সভাপতি, বেসিস
স্টার্টআপের বিশ্বচিত্র
উন্নত দেশে স্টার্টআপ জনপ্রিয় ও সফল। বড় বিনিয়োগকারীদের পুঁজিতে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও পাঠাও, টেন মিনিট স্কুলের মতো কিছু স্টার্টআপ বিদেশি পুঁজিতে সফল। বিশ্বে ওপেনএআই, স্পেসএক্স, স্ট্রাইপ, বাইটড্যান্সের মতো স্টার্টআপ বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। সান ফ্রান্সিসকোতে ৭ হাজার ৮৪১টি স্টার্টআপ রয়েছে, যার মধ্যে উবার, ওপেনএআইসহ অনেকগুলো বিশ্বব্র্যান্ড হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বেসিসের সাবেক সভাপতি ও বিডিজবসের সিইও এ কে এম ফাহিম মাসরুর বলেন, ‘নতুন স্টার্টআপ কোম্পানি গঠনের উদ্যোগটি একটা ভালো উদ্যোগ। বর্তমানে স্টার্টআপের জন্য বিদেশ থেকে পুঁজি আনা দুরূহ। ব্যাংকের তহবিল দিয়ে ২০০-৩০০ স্টার্টআপে পুঁজি জোগান দেওয়া যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে স্টার্টআপ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা জরুরি। প্রকল্প বাছাই করাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের দিয়ে প্রকল্প বাছাই না করলে বিনিয়োগ করেও সফল না হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’






