আজকাল ইরানের দীর্ঘদিনের শত্রু বলে পরিচিত ইরাকের জনগণের মধ্যে ইরানের প্রতি এক ধরনের ভক্তির ছাপ লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু এর পেছনে কী কারণ? এর রহস্য উদঘাটন করতে হলে ফিরে যেতে হবে আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সেই আট বছরের ভয়ংকর দিনগুলোতে।
এই ইরানপন্থী মনোভাবের মূল শিকড় রয়েছে ঠিক সেই যুদ্ধের পরিণতিতে। ২০০৩ সালের পর ইরাকে জাতীয়তাবাদের চেয়ে সম্প্রদায়গত বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার একটা কৃত্রিম সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা বাস্তবতাকে বিকৃত করে তৈরি।
যাঁরা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাসেম সোলেইমানি বা আয়াতুল্লাহ খামেনির জন্য বিলাপ করছেন, তাঁদের বংশধর পরীক্ষা করলে এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা ধরা পড়বে। তাঁদেরই পিতা, দাদা বা ভাইরা আশির দশকে ইরানের বিপ্লবী মতাদর্শের বিরুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন।
অথচ আজকের তরুণ প্রজন্ম সেই রক্তাক্ত ইতিহাস ভুলে গিয়ে ঠিক সেই ব্যবস্থাকেই মহিমান্বিত করছে, যা প্রতিরোধ করতে তাঁদের পূর্বপুরুষরা প্রাণ হারিয়েছিলেন।
এক প্রজন্মের উত্তরাধিকার এভাবে কী করে এতটা নাটকীয়ভাবে বদলে যায়? এটা কি ইরানের সম্প্রদায়গত কৌশলের বিজয়, যা ইরাকি জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করেছে? নাকি ২০০৩-এর পরবর্তী ইরাকের রাজনৈতিক-সামাজিক অজ্ঞতার প্রকাশ? ইরাকের নাগরিকরা আজ এমন এক শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন দিচ্ছেন, যা তাঁদের দেশের সার্বভৌমত্ব শুষে নিচ্ছে।
বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আলি আল-ওয়ার্দির মতে, ইরাকের নাগরিকদের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের দ্বিচারিতা কাজ করে। একদিকে গোত্রীয় রক্ষণশীলতা ও নগরকেন্দ্রিক আধুনিকতা, অন্যদিকে ধর্ম নিয়ে প্রদর্শনবাদ ও সাম্প্রদায়িক আবেগে মিশে যাওয়ার প্রবণতা।
ইরানের শাসকেরা ইরান-ইরাক যুদ্ধের ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ ধারণাকে আজ একটি বহুজাতিক মতাদর্শে পরিণত করেছেন। ফলে বর্তমান ইরাকের নাগরিকেরা যখন খামেনির প্রশংসা করেন, তখন তাঁরা আসলে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমর্থন করেন না, বরং তাঁরা নিজেদের এক কাল্পনিক বা বিকৃত অস্তিত্ব রক্ষা করতে চান।
তবে ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝার জন্য শুধু ওয়ার্দি যথেষ্ট নন। এখানে প্রাসঙ্গিক গুস্তাভ ল্য বঁ-এর কালজয়ী বই ‘দ্য ক্রাউড: আ স্টাডি অব দ্য পপুলার মাইন্ড’।
ল্য বঁ-র মতে, জনতা সত্য খোঁজে না, বরং মোহ বা অলীক ধারণায় ঐক্য ও শক্তি খুঁজে। এই উন্মাদনা গণমাধ্যমকেও গ্রাস করে, যেমন আজ ইরাকি মিডিয়ায় দুর্নীতিবাজ নেতা বা সাম্প্রদায়িক ধর্মগুরুকে পবিত্র করা হয়।
বইটির ভূমিকায় লেখক সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বি. এডেলম্যান বলেছেন, ইরাকে রাজনীতি হয়ে উঠেছে ধর্মের আধুনিক রূপ। মানুষ সত্যের চেয়ে সম্প্রদায়গত পরিচয়কে বড় মনে করে।
এই সংকটের মূলে ইরানের রাষ্ট্রীয় কৌশল। শিয়া সম্প্রদায়কে বুঁদ করে রাখা হয়েছে যে তারা অস্তিত্বসংকটে রয়েছে এবং তেহরানই তাদের একমাত্র রক্ষক। ইরানি বংশোদ্ভূত বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসেরের যুক্তি অনুসারে, ইরান আর বিপ্লব রপ্তানি চায় না, বরং শিয়াকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক রেখা গড়তে চায়। এতে প্রত্যেক শিয়া নাগরিককে বিশ্বাস করানো হচ্ছে যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও শত্রুদের থেকে বাঁচাতে তেহরানের আধিপত্য জরুরি।
ইরাকের এই ‘ইরান ভক্তি’ তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথম, ২০০৩-এর পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় আনুগত্যের চেয়ে সাম্প্রদায়িক বা দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়, ইরান নিজেদের শিয়াদের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং আইএসআইএস বা দায়েশ-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে আধাসামরিক বাহিনীকে ত্রাণকর্তা রূপ দিয়েছে।
তৃতীয়, রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব এমন পর্যায়ে যে যৌক্তিক বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। এক ইরাকি দারিদ্র্য, বিদ্যুৎ সংকট বা দুর্নীতিতে কষ্ট পেলেও কাসেম সোলেইমানির প্রশংসায় কবিতা লেখেন। তিনি বুঝতে পারেন না যে দেশের করুণ অবস্থার পেছনে ঠিক যে প্রভাবগুলো দায়ী, তাই-ই তিনি পূজা করছেন।
ইরানের শাসকেরা ইরান-ইরাক যুদ্ধের ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা’ ধারণাকে বহুজাতিক মতাদর্শে পরিণত করেছেন। ফলে ইরাকের নাগরিকরা খামেনির প্রশংসা করলে আসলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমর্থন করেন না, বরং কাল্পনিক বিকৃত অস্তিত্ব রক্ষা করতে চান।
এটা নিষ্ঠুর পরিহাস। এই মানুষরা যদি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত পূর্বপুরুষদের চোখের দিকে তাকাতেন, তবে প্রকৃত জাতীয়তাবাদের অর্থ খুঁজে পেতেন—যেখানে কোনো সুপ্রিম লিডার বা বহিঃশক্তির প্রয়োজন নেই।
ইতিহাস বিজয়ীদের হাতে লেখা হয় এবং আজকের বিজয়ীরা ইতিহাস নতুন করে ইরাকিদের মনে গেঁথে দিচ্ছে। এক দেশের সীমানা যখন অন্য দেশের স্বার্থে বিলীন হয়, তখনই জন্ম নেয় এই আত্মবিস্মৃতি।
কারাম নামা ব্রিটিশ-ইরাকি লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত






