ময়মনসিংহের তারাকান্দায় স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন রিপা আক্তার। ছেলে সাইফান ইসলামকে হামের টিকা দিতে তিনি ছুটে এসেছেন ঢাকার মিরপুরে বাবার বাড়িতে। বুধবার সকালে মিরপুরের আরামবাগ আবাসিক এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একটি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছেলেকে টিকা দেন রিপা। টিকা দিতে পেরে মনে থাকা আতঙ্ক কিছুটা কমেছে বলে জানান এই মা।
রিপার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গর্ভধারণের কয়েক মাস পর তিনি মিরপুরে বাবার বাড়িতে চলে আসেন। গর্ভকালীন সেবা এবং সন্তানের জন্মের পর প্রয়োজনীয় টিকাগুলো বাবার বাড়ির কাছের ওই নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই নিয়মিত নিয়েছেন। পরে স্বামীর বাড়ি ময়মনসিংহে ফিরে যান তিনি।
সম্প্রতি হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন রিপা। গত ১২ মার্চ ছিল ছেলের হামের দ্বিতীয় ডোজ টিকার তারিখ। কিন্তু ঈদের আগে ঢাকায় না আসায় টিকা সময়মতো দেওয়া হয়নি। প্রকোপ বাড়ার পর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, টিকা প্রতি মাসে নির্ধারিত এক দিন দেওয়া হয়, যা এপ্রিলের শেষে।
আর অপেক্ষা করতে না চেয়ে ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন রিপা। তিনি বললেন, ‘দেরি না কইরা চলে আসছি। এনে আইলাম, পোলার টিকা দিলাম। এহন মনডা একটু হালকা লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘টিকা দিলে আর দুশ্চিন্তা থাকে না।’
দেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রকোপ বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় টিকা কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন। অনেকে ঢাকায় আত্মীয়স্বজনের কাছে এসে হামের টিকা নিচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত ও সহজলভ্য টিকাদান না হলে শিশুদের ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
খুলনার তাকিয়া রহমানও ঢাকায় বেড়াতে এসে ছেলে উসাফ উজ জামানকে হামের টিকা দিয়েছেন। তাকিয়ার ছেলের টিকা কার্ড খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার। ঈদে মিরপুরে বাবার বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। তাকিয়া রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা হামটাকে অনেক লাইটলি (হালকভাবে) নিতাম। এটা নিয়ে আমরা এত বেশি সচেতন ছিলাম না। ঈদের পর থেকে দ্রুতই অনেক বাচ্চা আক্রান্ত হচ্ছে, অনেকে মারাও যাচ্ছে। এটা মায়েদের জন্য খুবই আতঙ্কের বিষয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কোনো দেরি করিনি। আজকেই টিকা দেওয়ার তারিখ ছিল। টিকা দিতে পেরে এখন আমার ভালো লাগছে। টিকা নিয়ে অনেক টেনশনে ছিলাম।’
আরামবাগ নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ক্লিনিক ম্যানেজার তামজিদা সুলতানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সকাল থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত পাঁচজন অভিভাবক সন্তানদের হামের টিকা দিয়েছেন। এছাড়া ইপিআই কর্মসূচির ৯টি টিকা নিতে অনেকে এসেছেন।
মিরপুরের দারুস সালামের বর্ধনবাড়ীতে ঢাকা উত্তর সিটির আরেক নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বুধবার দুপুরে দেখা যায়, অনেক মা সন্তানদের নিয়ে হামের টিকা দিতে আসছেন। অন্যান্য টিকা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যও ভিড় লেগেছে। সেখানে গৃহিণী আঁখি আক্তার মেয়ে হুমায়রা আক্তারকে হামের টিকা দিয়েছেন। আঁখি আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মায়েদের সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তাঁর সন্তানকে নিয়ে। সন্তানের খারাপ কিছু কোনো মা-ই মেনে নিতে পারেন না। হামের টিকা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু টিকাটি দিতে পেরে ভালো লাগছে।’ তিনি নির্ধারিত তারিখেই টিকা দিয়েছেন।
ওই কেন্দ্রের কর্মকর্তা সারোয়াত জাহান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হামের প্রকোপ বাড়ায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে দূর থেকে এসে টিকা নিচ্ছেন। মুঠোফোনে টিকা কার্ডের ছবি দেখালেই অনলাইনে যাচাই করে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে হামের টিকা পর্যাপ্ত রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ১০টি অঞ্চলের ৬টিতে নগর মাতৃসদন ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র মিলে ৩৬টি সেবাকেন্দ্র রয়েছে। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সব দিন টিকাসেবা চলে। স্থায়ী ইপিআই কেন্দ্র ৬০টি। ভ্রাম্যমাণ সেবাকেন্দ্রে মাসে দুবার সেবা দেওয়া হয়। ভুলে গেলে বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া হয়।
ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঢাকা উত্তর সিটিতে হামের টিকা (এম-আর) এর কোনো সংকট নেই। স্বাভাবিকভাবে টিকাদান চলছে। নিয়ম অনুযায়ী সবাইকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে আগামী রোববার থেকে সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে এখনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।






