সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং একটি বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘বৈজ্ঞানিক লাইফস্টাইল ডেভেলপমেন্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম’ শিরোনামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী সমাজ ও নাগরিক সমাজের তীব্র আপত্তার মুখে সরকার সম্প্রতি এই চুক্তি স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীদের জন্য গৃহীত কোনো উদ্যোগ কি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘স্কুল সাইকোলজি’র বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মেনে চলছে, নাকি এটি কোনো নির্দিষ্ট দর্শনের প্রচার?

স্কুল সাইকোলজি বা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ প্রমাণভিত্তিক হতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োগ করা পদ্ধতিগুলো পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হতে হবে। বর্তমান ‘লাইফস্টাইল’-ভিত্তিক শিক্ষাগুলো প্রায়শই নির্দিষ্ট জীবনদর্শনের ওপর নির্ভর করে, যা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বা সাইকিয়াট্রির স্বীকৃত প্রটোকল থেকে আলাদা।

স্কুলে মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত স্কুল সাইকোলজিস্ট। ভলান্টিয়ার-ভিত্তিক কার্যক্রম বা মোটিভেশনাল স্পিচ সাময়িক উদ্দীপনা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যেমন ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন, আত্মহত্যার প্রবণতা, একাডেমিক অমনোযোগিতা বা উদ্বেগ মোকাবিলায় কার্যকর নয়। অবৈজ্ঞানিক কাউন্সেলিং হিতে বিপরীত ফলও দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ‘মেন্টাল হেলথ গ্যাপ অ্যাকশন প্রোগ্রাম’–এর (এমএইচজিএপি) মাধ্যমে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বিশেষজ্ঞের অভাব মেটাতে সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মী ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পথ দেখিয়েছে। এটি কঠোর বৈজ্ঞানিক প্রটোকল মেনে হতে হবে। ডব্লিউএইচওর মতে, স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি সর্বজনীন, বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। শিক্ষকরা ‘গেটকিপার’ হিসেবে প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করে গুরুতর ক্ষেত্রে পেশাদার সাইকোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে রেফার করবেন। কোনো সংস্থার ব্যক্তিগত ধ্যানধারণা বা ‘লাইফস্টাইল প্যাকেজ’ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার বিকল্প নয়।

ভুটান ও শ্রীলঙ্কা তাদের জাতীয় শিক্ষানীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে একটি ‘লাইফ স্কিল’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং শিক্ষকদের ডব্লিউএইচওর প্রটোকলে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তারা কোনো বেসরকারি একক প্রতিষ্ঠানের দর্শনের ওপর নির্ভর না করে কঠোরভাবে রাষ্ট্রীয় ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা অনুসরণ করছে। আমাদের দেশেও ইতিমধ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে পেশাজীবীদের এ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশগুলো স্কুল সাইকোলজিতে কার্যকর মডেল গড়ে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের দিল্লি সরকার সরকারি স্কুলে ‘হ্যাপিনেস কারিকুলাম’ চালু করেছে। এটি মাইন্ডফুলনেস, নৈতিক গল্প ও দলগত কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের মানসিক চাপ কমায় এবং ইতিবাচক জীবনবোধ গড়ে তোলে। এটি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক দর্শনের ওপর নয়, সোশ্যাল সাইকোলজি ও নৈতিক শিক্ষার বিজ্ঞানসম্মত সমন্বয়।

একইভাবে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা জাতীয় শিক্ষানীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘লাইফ স্কিল’ করে শিক্ষকদের ডব্লিউএইচও প্রটোকলে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দর্শনের ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রীয় ও বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা মেনে চলে। আমাদের দেশেও বিভিন্ন পর্যায়ে পেশাজীবীদের এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

দেশে বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রমের উদাহরণ ইউনেসকো ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিজি) যৌথ ‘সোশ্যাল অ্যান্ড ইমোশনাল লার্নিং’ (এসইএল) মডেল। এটি শিক্ষার্থীর আত্মসচেতনতা, আত্মব্যবস্থাপনা, সামাজিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের দক্ষতা লক্ষ্য করে। ‘ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান’ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘ইন্টিগ্রেটেড স্কুল মেন্টাল হেলথ প্রটোকল’ তৈরি করা।

ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগে তিনটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথম, এনজিও বা বেসরকারি সংস্থার মডিউল পেশাদার সাইকোলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনুমোদন পাবে। দ্বিতীয়, উপজেলা-জেলা পর্যায়ে স্কুল সাইকোলজিস্ট নিয়োগের পরিকল্পনা করতে হবে, যাঁরা শিক্ষকদের তদারকি করবেন। তৃতীয়, ইউনেসকোর এসইএল মডেল জাতীয় শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা বা দেশীয় বিশেষজ্ঞদের যুগোপযোগী মডেল তৈরি করে পাইলটিংয়ের মাধ্যমে যাচাই করে বাস্তবায়ন করা।

  • ইমদাদুল হক তালুকদার মানসিক জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ

    [email protected]