যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী এখনও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়—এই স্পষ্ট স্বীকারোক্তি দিয়েছেন বাহিনীর প্রধান ফার্স্ট সি লর্ড জেনারেল স্যার গুইন জেনকিন্স। এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান নাজুক অবস্থান সবার সামনে তুলে ধরেছে।

সম্প্রতি এক বক্তব্যে জেনারেল স্যার গুইন জেনকিন্স সতর্ক করে বলেন যে, যুদ্ধের ময়দানে সফলভাবে লড়াই করার সক্ষমতা অর্জনে নৌবাহিনীর আরও অনেক কাজ বাকি আছে। এই মন্তব্য এলো এমন সময়ে যখন কিয়ার স্টারমার সরকার প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট নিয়ে সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে।

ইরান সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাজ্যের অবস্থানকে নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গত মঙ্গলবার ট্রাম্প যুক্তরাজ্যকে উদ্দেশ করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ ভাঙতে সহায়তা না করলে ব্রিটিশদের উচিত তাদের নিজস্ব তেলের ব্যবস্থা করা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন যে ব্রিটেনসহ যেসব দেশ হরমুজ প্রণালির জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা যদি নিজেরা লড়াই করতে না শেখে তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আর সহায়তা করবে না।

ইরানের ওপর হামলার মাধ্যমে নিজের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে দাবি করে ট্রাম্প ওভাল অফিস থেকে সাংবাদিকদের জানান, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সেখান থেকে বিদায় নেবে। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে সেখানে মার্কিন সেনাদের থাকার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।

এদিকে ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করতে জাহাজ না পাঠানোয় তিনি ব্যঙ্গ করে রয়্যাল নেভিকে ‘বড় ও ফালতু নৌবাহিনী’ বলে উপহাস করেন। এর আগে ট্রাম্পও ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরিগুলোকে ‘খেলনা’ বলে উপহাস করেছিলেন।

নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার সূত্রপাত হলে ব্রিটেনের ছয়টি ডেস্ট্রয়ারের মধ্যে চারটিই মেরামতের জন্য অকেজো ছিল। সাইপ্রাসের বিমানঘাঁটি রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা হচ্ছে। এছাড়া ন্যাটোর বাধ্যবাধকতা রক্ষায় উত্তর আটলান্টিকে জার্মানির কাছ থেকে যুদ্ধজাহাজ ধার করতে হয়েছে ব্রিটেনকে।

প্রতিরক্ষা খাতে ব্রিটিশ সরকারের বরাদ্দ নিয়ে পর্দার আড়ালে চরম মতবিরোধ চলছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি টেলিগ্রাফ। ব্রিটিশ সেনাপ্রধানরা প্রধানমন্ত্রীকে জিডিপির ৩ শতাংশ অর্থ প্রতিরক্ষায় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষার দাবি জানালেও চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।

এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের বিরোধিতা করে ইতালি ও স্পেন তাদের বিমানবন্দর ও আকাশপথ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে স্পেনের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন যে ব্রিটেনসহ যেসব দেশ হরমুজ প্রণালির জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা যদি নিজেরা লড়াই করতে না শেখে তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আর সহায়তা করবে না। ট্রাম্পের ভাষায়, এখন থেকে আপনাদের নিজেদের তেলের লড়াই নিজেদেরই লড়তে হবে।

এই অস্থিতিশীলতার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৮ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানি সংকটের ফলে চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।

তবে এত টানাপোড়েনের মধ্যেও এপ্রিল মাসে ব্রিটেনের রাজা ও রানির যুক্তরাষ্ট্র সফর করার কথা রয়েছে। সমালোচকেরা এই সফর বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তবে কূটনৈতিক মহলে আশা করা হচ্ছে যে রাজার সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্ক দুই দেশের বর্তমান তিক্ততা কমিয়ে আনতে সহায়তা করবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে পরবর্তী করণীয় জানাতে বুধবার রাতে মার্কিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এই ভাষণ থেকে ইরান ও মিত্র দেশগুলোর বিষয়ে পরবর্তী দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে তারা পরমাণু প্রতিরোধব্যবস্থাসহ দেশ ও বিদেশের নিরাপত্তায় যেকোনো অভিযানে অংশ নিতে প্রস্তুত। তবে যুদ্ধের প্রস্তুতিতে যে ঘাটতি রয়ে গেছে তা সেনাপ্রধানের বক্তব্যে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে।

  • টম কটেরিল ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিরক্ষাবিষয়ক সম্পাদক

    ডেইলি টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত