বাংলাদেশ এখন গভীর জ্বালানিসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এখনো দেখা যাচ্ছে, যা অনিয়মিত সরবরাহ এবং সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কা প্রকাশ করে। এটি কেবল তাৎক্ষণিক চাপ নির্দেশ করে না, বরং জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাও উন্মোচিত হয়েছে। সরকার এই দুর্বলতা ও আকস্মিক ধাক্কা দ্রুত সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনীয় জ্বালানি আগেভাগে নিশ্চিত করা। উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সংগ্রহের প্রেক্ষাপটে আমদানি পরিকল্পনাকে তিনটি ধাপে ভাগ করা দরকার। প্রথম ধাপে আগামী এক থেকে তিন মাসের তাৎক্ষণিক স্বল্পমেয়াদি কার্গো নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ। তৃতীয়ত, পরিস্থিতি খারাপ হলে জরুরি মজুত বা কন্টিনজেন্সি ব্যবস্থা রাখা।

এখানে আমদানির কৌশলকে তাৎক্ষণিক বাজারসুযোগনির্ভর পদ্ধতি থেকে সরিয়ে সুপরিকল্পিত পোর্টফোলিওভিত্তিক কাঠামোয় নিয়ে যাওয়া জরুরি। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং এলএনজির ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে বহুমুখী সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক গড়তে হবে। সরকারি ও বেসরকারি খাতকে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ দিয়ে পরিবহন ব্যয় ও সময়সীমা বাস্তবসম্মত করতে হবে।

জ্বালানির চাহিদা ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া দরকার। অর্থনৈতিক অবদান কম খাতে ব্যবহার কমাতে হবে, রপ্তানিমুখী শিল্প, খাদ্য উৎপাদন, সার উৎপাদন, সেচ ও নগর গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক অস্থায়ী রেশনিং চালু করা যায়, যেমন সরকারি ভবনের কার্যঘণ্টা কমানো, সরকারি যানবাহনের জ্বালানি সীমিত করা, অলংকারমূলক আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা খাদ্যনিরাপত্তার খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সুসংহত বণ্টন পদ্ধতি চালু করা।

এই সংকটকে কেবল তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে একটি সংস্কারের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জ্বালানি খাতে নীতি সমন্বয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক বেশি সক্ষম হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ আমদানির জন্য রিজার্ভ সংরক্ষণ করতে হবে। টাকার মান ধরে রাখতে অতিরিক্ত ডলার বিক্রি না করে বিনিময় হার ধীরে ধীরে সমন্বয় হতে দিতে হবে, যাতে বাজারে অস্থিরতা কমে। অনুকূল পরিস্থিতিতে ডলার ক্রয় করে রিজার্ভ পুনর্গঠন করা উচিত। জ্বালানিসংকটে জ্বালানি, সার, খাদ্য, ওষুধ ও রপ্তানি কাঁচামালকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বর্তমানে নীতি সুদ কমানো যুক্তিযুক্ত নয়, যদিও উচ্চ সুদ অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সময় সুদ কমালে সাময়িক বৈদেশিক মুদ্রাজনিত মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী দেশীয় মূল্যস্ফীতিতে পরিণত হতে পারে, চাহিদা বাড়বে, টাকার মান কমবে, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং জ্বালানি, সার, খাদ্যের দাম আরও উঠবে।

দ্বিতীয় ধাপের মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি উপেক্ষা করা যাবে না। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন, বিদ্যুৎ, সেচ, সারের খরচ বাড়ায়, যা খাদ্য ও সেবার দামে প্রতিফলিত হয়। মুদ্রানীতি শিথিল করলে মজুরি বৃদ্ধি, মূল্য নির্ধারণ আচরণ ও ঋণ সম্প্রসারণ মিলে মূল্যস্ফীতি স্থায়ী হতে পারে। তাই সুদের হার স্থির বা কড়াকড়ি রাখা প্রবৃদ্ধি দমনের জন্য নয়, স্থবিরতা ও মূল্যস্ফীতির যৌথ সংকট বা স্ট্যাগফ্লেশন প্রতিরোধের জন্য জরুরি।

কড়াকড়ি মুদ্রানীতি একা সমাধান দেবে না। সরকারকে জ্বালানি মূল্য নিয়ন্ত্রণের বদলে লক্ষ্যভিত্তিক আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নিতে হবে। সীমিত রাজস্বে বৃহৎ ভর্তুকি সম্ভব নয়, তা উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়াতে পারে। পরিবর্তে নিম্ন আয়ের পরিবার, সেচনির্ভর ক্ষুদ্র কৃষক, গণপরিবহন ও রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পকে নির্দিষ্ট সময় ও মানদণ্ডে সহায়তা দেওয়া কার্যকর।

পরিবহন খাতে প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনকে সহায়তা দিতে হবে। কৃষিতে সেচের জন্য ডিজেল সহায়তা ও নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ উৎপাদন ব্যয় বাড়লে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়।

জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ সূত্রভিত্তিক রাখতে হবে, তবে স্থিতিশীলতা উপাদান যোগ করা দরকার। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বজায় রেখে উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মূল্য হঠাৎ বাড়লে ধাপে ধাপে সমন্বয় করা, কমলে সংরক্ষণ করে স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করা উচিত।

মধ্যমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন দক্ষতা বাড়ানো, সিস্টেম ক্ষতি কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং নতুন এলএনজি অবকাঠামোতে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এই সংকট দেখিয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু চুক্তির বিষয় নয়, উৎস বৈচিত্র্য, মজুত, অর্থায়ন, মূল্যশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক সমন্বয়ের সমন্বয়।

এখন সবচেয়ে ভালো কৌশল দ্রুত জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা, উৎস বৈচিত্র্য, মুদ্রা সংরক্ষণ, কড়াকড়ি মুদ্রানীতি বজায় রাখা এবং সর্বজনীন ভর্তুকির বদলে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। এই সংকটকে টেকসই জ্বালানিব্যবস্থা গড়ার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।

জ্বালানি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি। পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত ক্ষমতা উন্নত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আঞ্চলিক কাঠামো ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তথ্যের স্বচ্ছতা ও জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। জ্বালানি সরবরাহ, মজুত ও মূল্যসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করলে আতঙ্ক কমবে, অপ্রয়োজনীয় মজুত নিরুৎসাহিত হবে। শিল্প ও নগর খাতে সাশ্রয়ের সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এই সংকটকে কেবল তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে একটি সংস্কারের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। জ্বালানি খাতে নীতি সমন্বয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক বেশি সক্ষম হয়ে উঠবে।

  • ফাহমিদা খাতুন অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ

  • মতামত লেখকের নিজস্ব