পাঁচ বছর আগে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে এক সদস্য প্রার্থীর সমর্থক হওয়ার অভিযোগে এক পরিবারের সদস্যদের দা-কিরিচ দিয়ে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লোহাগাড়া থানায় মামলা দায়ের হয়। পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় এবং আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করে। সাক্ষ্য শুরুর অপেক্ষায় থাকা এই মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বাদী মামলাটি রাজনৈতিক নয় বলে দাবি করে আদালতে প্রত্যাহারের আপত্তি জানিয়েছেন এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন এই মামলার শুনানি ৫ এপ্রিল ধার্য হয়েছে। ঘটনা ঘটে ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর। মামলার নথি অনুযায়ী, ইউপি নির্বাচনে সদস্যপদ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সমর্থকদের ওপর প্রতিপক্ষ জানে আলমের লোকজন দা, কিরিচ, লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত হন নুর আহাম্মদ, বশির আহম্মদ ও নুরুন্নাহার। এছাড়া আনোয়ার, রেহেনা আক্তার, আসমাউল হুসনা, দিলুয়ারা বেগমসহ ১০ জন আহত হন। প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী তানজিলা সুলতানা বাদী হয়ে মামলা করেন। তদন্ত শেষে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন পরিদর্শক নুর আহমদ ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দেন। অভিযোগপত্রে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রেজাউল বাহার, জানে আলম, ইরফানুল হক চৌধুরী, মাহাবুবুর রহমানসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে আছেন।

অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্য শুরুর জন্য অপেক্ষমাণ।

সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের মধ্যকার রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর বেশ কিছু মামলায় প্রত্যাহারের সুপারিশ হয়েছে। লোহাগাড়া থানার এই মামলায় আসামিরা আবেদন করায় তাও প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়।

বিষয়টি জানার পর গত ফেব্রুয়ারিতে বাদী আদালতে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, আসামিরা বাদীর পরিবারের লোকজনকে ধারালো অস্ত্র, দা, কিরিচ ও বন্দুক দিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করে। এতে কয়েকজন গুরুতর আহত হন। আসামিরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক মামলা বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সুপারিশ নিয়ে এসেছে। এটি প্রত্যাহার হলে বাদী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।

মামলার বাদী তানজিলা সুলতানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আসামিরা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউপি নির্বাচনে তাঁদের হয়ে কাজ না করায় বাদীর পরিবারের লোকজনের ওপর হামলা চালান। আসামিদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার মামলাও রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে তাঁরা তুচ্ছ ঘটনায় এই হামলা চালিয়েছেন। এটি রাজনৈতিক কোনো হামলা নয়। মামলাটি প্রত্যাহারের সুপারিশ নাকচ করে আসামিদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি করেন তিনি।

আসামি সিরাজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠের কাছে দাবি করেন, রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে। নিজেকে একসময়ের বিএনপির কর্মী দাবি করেন তিনি। এক প্রশ্নের উত্তরে সিরাজুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের কারও সঙ্গে তাঁর সখ্য নেই। তাঁর স্কুলে তৎকালীন আওয়ামী লীগের লোকজন এসেছিল, তাঁদের সঙ্গে হয়তো ছবি থাকতে পারে।

চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আশফাক হোসেন চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বেশির ভাগ মামলা পুলিশ কিংবা বিগত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের করা। লোহাগাড়ার মামলাটি ইউপি নির্বাচনে এক প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে মারধরের। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।