বাংলাদেশের কোনো জেলা বা উপজেলায় পাউবো পোল্ডার বা বেড়িবাঁধ তৈরি হয়নি এমন জায়গা নেই, আবার কোনো উল্লেখযোগ্য নদীর ওপর স্লুইসগেট বা ফ্ল্যাপগেটের মতো কাঠামো উঠেনি এমন নদীও নেই। কিন্তু এসব থেকে দেশ কতটা লাভবান হয়েছে? পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন নজরুল ইসলাম। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে এবং তাতে ‘বেলা’র (বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট ল ইয়ারস অ্যাসোসিয়েশন) প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পানিসম্পদ ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব পেলে বড়াল অবমুক্তকরণের জন্য অনুকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
তিনি বড়াল এলাকা পরিদর্শন করেন এবং পাউবো কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বড়ালের অবমুক্তির বিষয়ে জনগণের অভিমত জানতে চান। স্থানীয় জনগণ ব্যাপকভাবে চারঘাট ও আটঘড়ির স্লুইসগেটগুলো অপসারণের দাবি জানান। অতঃপর উপদেষ্টা পাউবোকে এসব স্লুইসগেট অপসারণের নির্দেশ দেন।
এই নির্দেশের পর পাউবো স্লুইসগেটগুলোর কপাট সাময়িকভাবে অপসারণ করে, কিন্তু সম্পূর্ণ অপসারণে সম্মত হয় না। পাউবো যুক্তি দেখায় যে ২০১৮ সালে সম্পাদিত সমীক্ষার সুপারিশবিরোধী পদক্ষেপ নিতে হলে এই সুপারিশ পুনর্বিবেচনার জন্য আরেকটি ‘কারিগরি কমিটি’ গঠন করা প্রয়োজন।
২০২৫ সালের ২৩ জুন প্রথমে আট সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটি গঠিত হয় এবং ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর তা ১৩ সদস্যে বর্ধিত করা হয়। এই কমিটিতে কয়েকজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ২০০৬ সাল থেকে বড়াল রক্ষা আন্দোলনের সদস্যসচিব হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে স্থানীয় জনগণের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং পাউবোর বোর্ড সদস্য হিসেবেও নিয়োগপ্রাপ্ত এস এম মিজানুর রহমানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।
২০২৫ সালের ১৪ নভেম্বর কমিটির সদস্যরা চারঘাট ও আটঘড়ির স্লুইসগেটগুলোসহ বড়াল এলাকা পরিদর্শন করেন এবং ১৬ দফা সুপারিশ প্রদান করেন। এর মধ্যে ৯টি সুপারিশ (২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ৯, ১২, ১৬) নদী খননসংক্রান্ত।
আপাতদৃষ্টিতে নদী খননের প্রস্তাব নির্দোষ মনে হতে পারে। কিন্তু নদ-নদীর প্রবাহ উন্মুক্ত না করে শুধু খননের মাধ্যমে স্থায়িত্বশীল উপকার পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে খননের প্রস্তাবও নির্দোষ নয়, কারণ এসব প্রায়ই নদ-নদী উন্মুক্ত করার মূল করণীয়কে আড়াল করে।
কারিগরি কমিটির আরও কয়েকটি সুপারিশ (যেমন ১০ ও ১৪) বহুলাংশে স্বতঃসিদ্ধ বিষয়ের পুনরাবৃত্তি। বাকি ৫টি সুপারিশ (১, ৭, ১১, ১৩, ১৫) স্লুইসগেট অপসারণের লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১ নম্বর সুপারিশে বলা হয় যে ২০১৮ সালের সমীক্ষাটি ৭ বছরের পুরোনো। সুতরাং এতে ব্যবহৃত মডেলটি ‘হালনাগাদ ও পুনর্যাচাই’ এবং ‘নতুন প্রস্তাবিত বিকল্পগুলোর যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন’।
৭ নম্বর সুপারিশে বলা হয় যে বড়াল পুনরুদ্ধার করতে হলে ‘২০১৮ সালের সমীক্ষার প্রস্তাবনা অনুযায়ী অথবা প্রয়োজনে সম্পূরক সমীক্ষার প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে’। এটি সমস্যাকীর্ণ, কারণ প্রথমত, ২০১৮ সালের প্রস্তাব বাস্তবায়িত করা কি না—এটাই কমিটির মূল দায়িত্ব ছিল, যা পালন না করে বিষয় উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এটি ১ নম্বর সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তৃতীয়ত, আরও সমীক্ষার দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপানো হয়েছে।
১১ নম্বর সুপারিশে স্লুইসগেট অপসারণের প্রভাব ‘বিস্তারিত সমীক্ষার মাধ্যমে রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করে’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। ১৩ নম্বরে ‘মরা বড়াল’ অংশের রেগুলেটর নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা প্রয়োজন। ১৫ নম্বরে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিকতা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সবখানেই নতুন সমীক্ষার প্রস্তাব।
এদিকে বাস্তবে একটি বড় ‘সমীক্ষা’ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। চারঘাট ও আটঘড়ির স্লুইসগেটের কপাটের ওপরের বড় অংশ কংক্রিট কাঠামোর অংশ, অপসারণযোগ্য নয়; নিচের লোহার পাত অপসারণযোগ্য। ২০২৫ সালের জুন মাসে এই লোহার পাত অপসারিত হয় এবং বর্ষায় গঙ্গার পানি বড়ালে প্রবাহিত হয়। প্রায় ৪০ বছর পর এই ঘটনা ‘অলৌকিক’ বলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে, হাজারো মানুষ ভিড় করে।
বড়াল পুনরুজ্জীবিত করতে স্লুইসগেট অপসারণ করে সেখানে সিএস অনুযায়ী নদের আদিপ্রস্থব্যাপী সেতু নির্মাণ প্রথম করণীয়। নদী খননের উৎসাহ ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ার মতো। এখন পাউবো নতুন যুক্তি দিয়েছে—গঙ্গার পানি বড়ালে এলে বন্যা হতে পারে, তাই কয়েক বছর অপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
প্রায় ৪০ বছর ধরে বড়ালে গঙ্গার পানি আসেনি, এককালের স্রোতস্বিনী নদী ‘মরা বড়ালে’ পরিণত হয়েছে। পাউবোর কোনো পরিতাপ নেই। কিন্তু এখন জনআন্দোলনের ফলে পানি প্রবেশের সুযোগ হতেই বন্যার ভয়ে তাদের উদ্বিগ্নতা।
বেড়িবাঁধের মাধ্যমে প্লাবনভূমিকে নদীখাত থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে প্লাবনভূমি ও নদীখাত—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাস্টারপ্ল্যানের বিদেশি প্রণেতারা বদ্বীপের এই মৌল সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরিতাপের বিষয় যে পানি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত বাংলাদেশের বেশির ভাগ কর্মকর্তারাও এই মৌল সত্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন না।
পাউবোর ‘তুরুপের তাস’ বড়ালের কাছের দয়ারামপুর সেনানিবাস। সেখানকার বাসিন্দারা দেশের মানুষ, মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরি। প্লাবনভূমিতে নদীর পানি স্বাগত জানানো উচিত; প্রয়োজনে নিজেরা বেড়িবাঁধ বা ভূমি উচ্চতা বাড়াতে পারেন। বড়াল অবমুক্তি চলনবিলের বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জাতীয় করণীয়; সেনাবাহিনীকে অন্তরায় করে জনগণের প্রতিপক্ষ করা অনুচিত।
বন্যার ভয় বদ্বীপে নদ-নদীর ভূমিকা সম্পর্কে মৌলিক ঘাটতির প্রমাণ। সক্রিয় প্লাবনভূমি প্লাবিত হবেই, যা পলীয়তন, ভূমি উন্নয়ন, জলাভূমি নবায়ন ঘটায়। বেড়িবাঁধে প্লাবনভূমি ও নদীখাত উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাস্টারপ্ল্যানের বিদেশি প্রণেতারা এ সত্য উপলব্ধি করেননি, বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও নয়।
কারণ দুটি: জ্ঞানগত—পাউবো প্রকৌশলীদের, নদী সম্পর্কে জ্ঞান কম। বৈষয়িক—বড় বাজেটের প্রকল্পে আকর্ষণ, কাঠামো নির্মাণে লাভ। ফলে জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত। পাউবো জনবিরোধী হয়ে উঠছে। জনইচ্ছার বিরুদ্ধে স্লুইসগেট বহাল রাখলে সংঘর্ষ হবে, দায় পাউবোর। অবস্থাদৃষ্টে পাউবো নদী রক্ষায় প্রতিবন্ধক হয়েছে। এ প্রতিবন্ধকতা কীভাবে দূর করা যায়?
নজরুল ইসলাম অধ্যাপক, এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান
মতামত লেখকের নিজস্ব






