সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তা নিঃসন্দেহে এক মহৎ উদ্যোগ। মুক্তকণ্ঠতে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় এর জন্য দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে।
কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে প্রতি বছর চালু বৃক্ষরোপণ অভিযান নিয়ে কোনো বছরভিত্তিক বা মোট পরিসংখ্যান পাওয়া যায় কি না, তা জানা যায়নি। এমন পরিসংখ্যান থাকলে বোঝা যেত, এ পর্যন্ত কত বৃক্ষ রোপিত হয়েছে, তাদের প্রজাতি, স্থান, বর্তমান অবস্থা এবং কত শতাংশ সফলভাবে টিকিয়ে রাখা গেছে। এ ধরনের সমীক্ষা থাকলে তা পথনির্দেশক হিসেবে কাজে লাগত এবং বর্তমান পরিকল্পনায় সহায়ক হতো।
সামাজিক বনায়ন বা ‘সুফল’ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এর অন্যতম কারণ, নীতিমালার বাইরে গিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পরিবর্তে সম্পর্কহীন মুনাফাসন্ধানী অসাধু চক্রকে জড়ানো। ফলে প্রকল্পে বিপর্যয় ঘটেছে এবং সাফল্য অঙ্কুরেই নষ্ট হয়েছে। ‘সুফল’ প্রকল্পে প্রাকৃতিক বন বা সৃজিত বনে গাছের নিচে অবৈজ্ঞানিকভাবে আবার গাছ লাগানোর ঘটনাও ঘটেছে।
বন বিভাগের মাঠস্তরের কর্মীদের সদিচ্ছা থাকলেও শুধু ওপর থেকে (টপ–ডাউন অ্যাপ্রোচ) পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ায় অনেক কার্যক্রম ব্যর্থ হয়েছে। যাদের বাস্তব জ্ঞান ও মাঠের অভিজ্ঞতা আছে, তাদের মতামত নেওয়া হলে এ ধরনের বিপর্যয় বা রাষ্ট্রীয় অপচয় এড়ানো যেত।
আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দালিলিক প্রমাণ বলছে—বনবাসী মানুষ যত দিন বনে থাকবে, বনের অবস্থা তত দিন ভালো থাকবে। বনের কার্যক্রমে ইচ্ছায় হোক বা অজ্ঞতাবশত, বনবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করার কারণে শূন্যতা থেকেই যায় এবং দেশ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বনে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর বন ও প্রথাগত অধিকার বিষয়ে আলাদা নীতিমালা হওয়া প্রয়োজন।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জাতীয় বন নীতি ২০২৫’ এবং ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬’ নীরবে জারি হয়েছে। দেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা আইন প্রণয়নে প্রকৃত অংশীজনদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রচারসর্বস্ব ও প্রকল্পনির্ভর সংস্থা বা ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন, যাদের জনগণের কাছে কোনো দায় নেই। ফলে আইন জারির পর সমালোচনা, ক্ষোভ ও আইনি জটিলতা দেখা দেয়।
জাতীয় বন নীতিতে বন ব্যবস্থাপনাকে রাজস্বকেন্দ্রিক থেকে সংরক্ষণমুখী করার লক্ষ্য ওঠানো হয়েছে। ভূমিকায় বনের অবক্ষয়, বননির্ভর জনগোষ্ঠীর দুর্দশা ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ হিসেবে বনভূমির অবৈধ ব্যবহার চিহ্নিত হয়েছে। প্রাকৃতিক বনের ব্যবহার বন্ধ ও বন সম্প্রসারণে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এসব নীতি ১৯২৭ সালের পুরোনো বন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০২৬’-এর কয়েকটি ধারায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রথাগত বন অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হলেও তা বিস্তারিত নয়। এ অস্পষ্টতা মাঠস্তরে আইন প্রয়োগে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
সত্যিকারের বনের অবক্ষয় শুরু হয়েছে রাষ্ট্র যখন বনবাসী জাতিগোষ্ঠীর পুরুষানুক্রমিক বনভূমিকে ‘সংরক্ষিত’ বা ‘রক্ষিত’ ঘোষণা করে তাদের প্রথাগত অধিকার খর্ব করেছে। পাশাপাশি বনের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়েছে। যেসব দেশে এমন হয়নি, সেখানে প্রাকৃতিক বনভূমি অটুট রয়েছে।
আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দালিলিক প্রমাণ বলছে—বনবাসী মানুষ যত দিন বনে থাকবে, বনের অবস্থা তত দিন ভালো থাকবে। বনের কার্যক্রমে ইচ্ছায় হোক বা অজ্ঞতাবশত, বনবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করার কারণে শূন্যতা থেকেই যায় এবং দেশ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বনে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর বন ও প্রথাগত অধিকার বিষয়ে আলাদা নীতিমালা হওয়া প্রয়োজন।
বন ও বৃক্ষ অধ্যাদেশে দেশীয় প্রজাতির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একক প্রজাতির বৃক্ষরোপণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি অপরিপক্ব গাছ কাটা ও অবৈধ নিধন রোধ জরুরি। অবৈধভাবে গাছ কাটায় করাতকলগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
‘করাতকল (লাইসেন্স) বিধিমালা ২০২৬’-এর খসড়ায় প্রতিরোধের চেয়ে লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও রাজস্ব আহরণের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। সংরক্ষিত বনভূমি উপজেলা সদর বা পৌরসভার লাগোয়া হওয়ায় করাতকলের দূরত্বের বিধান পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
বনায়নের বাণিজ্যিক উপযোগিতার পাশাপাশি পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনেকে সচেতন নন। কার্বন ট্রেডিং ছাড়াও প্রাকৃতিক বন সৃজন, বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গণসচেতনতা বাড়ানো দরকার।
ক্যামেরার সামনে গাছ রোপণকারী বা প্রচারে সফলদের পাশাপাশি নীরবে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করা নীরব বীরদের স্বীকৃতি দিতে হবে। এ বিপুল জনসংখ্যার দেশে শুধু দণ্ড বা জরিমানায় বন রক্ষা সম্ভব নয়; শিক্ষা, গবেষণা, জনসচেতনতা এবং প্রকৃত অংশগ্রহণমূলক বন ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
পিডিশন প্রধান সভাপতি, বৃহত্তর সিলেট আদিবাসী ফোরাম
মতামত লেখকের নিজস্ব






