সাড়ে তিন বছর আগে লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই অবিস্মরণীয় রাত। লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখে অনেকেরই মনে হয়েছিল, ফুটবল পেয়েছে তার চূড়ান্ত পরিপূর্ণতা। টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচে সাত গোল, ফাইনালে দুটি। সঙ্গে তিন অ্যাসিস্ট। ‘গোল্ডেন বল’ পাওয়াটা ছিল তার জন্য স্বাভাবিক। মেসি শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ছিলেন না, ছিলেন দলের প্রাণশক্তি।

তবে ২০২২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কেবল ‘মেসির দল’ বলা অন্যায়। হুলিয়ান আলভারেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং এনজো ফার্নান্দেজরা বিশ্বমঞ্চে রাজকীয় আচরণ করে নিজেদের প্রমাণ করেছিলেন। ফার্নান্দেজ পেয়েছিলেন সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার। নিকোলাস ওতামেন্দি অদম্য মনোবল নিয়ে প্রতিরক্ষায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আনহেল দি মারিয়া ছিলেন অসাধারণ। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ পেনাল্টি শুটআউটে প্রতিপক্ষের আতঙ্ক হয়ে উঠেছিলেন।

সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারের পর আর্জেন্টিনা যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, সেই একতা ও মনোবল অন্য কোনো দল ছুঁতে পারেনি।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রান্তে এসে আর্জেন্টিনা কোথায় দাঁড়িয়ে? আর্জেন্টিনা বাজে খেলার পর স্কালোনি বললেন, ‘এটাই বাস্তব’।

এখন ছবিটা অনেক ফিকে। লিওনেল স্কালোনির দল মাঠে নামছে ঠিকই, কিন্তু চ্যাম্পিয়নদের সেই দাপট আর নেই। প্রস্তুতি এলোমেলো। সব ভার আবার লিওনেল মেসির কাঁধে। ৩৭ বছর বয়সে এ ভার বহন সহজ নয়।

কাগজে আর্জেন্টিনার বাছাইপর্ব চমৎকার। কনমেবল টেবিলে শীর্ষে, দ্বিতীয় ইকুয়েডরের চেয়ে ৯ পয়েন্ট এগিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে। সবচেয়ে বেশি গোল, মেসি ৮ গোল করে প্রথমবারের মতো শীর্ষ গোলদাতা।

কিন্তু সংখ্যাগুলো বলে না বাকি দলগুলো কত দুর্বল ছিল। উরুগুয়ে ও ব্রাজিল চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে শেষ করেছে। উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ের কাছে হার, ঘরের মাঠে কলম্বিয়ার সঙ্গে ১-১ ড্র—এগুলো স্কালোনির জন্য সতর্কতা। কোপা আমেরিকা জিতলেও সেরা ফুটবল খেলেনি আর্জেন্টিনা।

মেসি কি বিশ্বকাপে খেলবেন: প্রশ্নের কী উত্তর দিলেন স্কালোনি।

বিশ্বকাপ প্রস্তুতির প্রথম ম্যাচ গত বছর অক্টোবরে ভেনেজুয়েলার বিপক্ষে ১-০ গোলে জয়। তারপর পুয়ের্তো রিকোকে ৬-০, অ্যাঙ্গোলাকে ২-০ গোলে হারিয়েছে। এই মার্চে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১১৫তম মৌরিতানিয়া ও ৯১তম জাম্বিয়া।

এসব ম্যাচ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সম্পর্কে কিছু বলে না। গত শুক্রবার বুয়েনস আইরেসে মৌরিতানিয়াকে ২-১ গোলে কদর্য জয়। এনজো ফার্নান্দেজ ও নিকো পাজের গোল নিষ্প্রাণ খেলা ঢাকেনি। বিরতির পর মেসি মাঠে নামেন। শেষে মৌরিতানিয়ার খেলোয়াড়রা অটোগ্রাফ ও সেলফির জন্য তাঁকে ঘিরে ধরে।

স্কালোনি বলেছেন, ‘ম্যাচটা আমরা ভালো খেলিনি এবং এটাই বাস্তব।’ গোলরক্ষক মার্তিনেজ বলেছেন, ‘এটা আমাদের খেলা সবচেয়ে খারাপ প্রীতি ম্যাচগুলোর একটা। তীব্রতা, খেলা, গতি—সবকিছুরই অভাব ছিল।’

মেসির ১০০০ গোল করতে কত দিন লাগতে পারে।

মৌরিতানিয়া ম্যাচের পর মার্তিনেজ বলেছেন, ‘ভাগ্যিস, বেঁচে গিয়েছি (ফিনালিসিমা বাতিল হওয়ায়)। যেভাবে খেলেছি আজ, তাতে ওই ম্যাচে নির্ঘাত হারতাম।’

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে স্পেনের সঙ্গে ফিনালিসিমা বাতিল। অন্য শক্তিশালী দলগুলো অন্য ম্যাচ নিশ্চিত করেছিল। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে খেলার সুযোগ ছিল, কিন্তু স্পেনের দর্শকদের সামনে ঝুঁকি নেয়নি আর্জেন্টিনা।

ইউরোপিয়ান দলের মুখোমুখি না হয়েই বিশ্বকাপে, যে ইতিহাসের জন্ম দিচ্ছে আর্জেন্টিনা।

নিকোলাস তালিয়াফিকো বলেছেন, ‘ট্রফি জয় ছাড়াও এটা গুরুত্বপূর্ণ হতো, কারণ আপনি এমন একটা দলের মুখোমুখি হতেন, যারা বিশ্বকাপ জেতার ক্ষমতা রাখে। এটা আপনাকে সাহায্য করত, নিজেদের বোঝা যেত।’ ২০২২ ফিনালিসিমায় ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাতার গিয়েছিল। এবার মৌরিতানিয়া-জাম্বিয়া ভরসা। লামিনে ইয়ামালের সঙ্গে মেসির মুখোমুখি হওয়া হলো না।

মেসি বিশ্বকাপে খেলবেন কি না, তা ধোঁয়াশা। অক্টোবরে বলেছিলেন, ‘ইন্টার মায়ামির সঙ্গে প্রি-সিজন শুরু হলে দেখব কেমন অনুভব করছি, শতভাগ প্রস্তুত আছি কি না দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেব। ম্যাচ ধরে, দিন ধরে এগোতে চাই।’ স্কালোনি বলেছেন, মেসি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। ‘আমি সব করব যাতে সে থাকে। ফুটবলের স্বার্থেই তাকে থাকতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটা তার।’

স্কালোনি মেসিকে চান কারণ তিনি এখনো ম্যাচ জিতাতে পারেন। এমএলএসে ৪ ম্যাচে ৪ গোল। কিন্তু ২০২২-এর সেই মেসি নেই। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত ৮ ম্যাচ, প্রতি পাঁচ-ছয় দিনে ৯০ মিনিট—৩৭ বছরের শরীর নেবে কি? স্কালোনি বলেছেন, ‘শুধু আর্জেন্টাইনরা নয়, সবাই তাকে দেখতে চায়। কিন্তু আমাদের দ্বিধা আছে—সে পুরো ম্যাচ খেলতে পারবে কি না।’

চোটে মেসি কলম্বিয়া ও ইকুয়েডরের ম্যাচ মিস করেন—দুটোতেই হেরেছে আর্জেন্টিনা। আনহেল দি মারিয়া কোপা আমেরিকার পর অবসর নিয়েছেন। নিকো গঞ্জালেস চেষ্টা করছেন, কিন্তু দি মারিয়ার জাদু নেই।

মাঝমাঠে রদ্রিগো দি পলের গতি কমেছে। ফার্নান্দেজ ও ম্যাক অ্যালিস্টার অধারাবাহিক নন।

তবে আশা আছে। হুলিয়ান আলভারেজ ফর্মে। লাওতারো মার্তিনেজ দুর্দান্ত। ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়ানো চমক দিতে পারেন। নিকো পাজ মেসির ছায়া। কিন্তু ২১ বছরে সাত ম্যাচের অভিজ্ঞতায় চাপ নেবে কি?

রিয়াল মাদ্রিদ কি মাস্তানতুয়োনোকে নষ্ট করে ফেলছে—আর্জেন্টিনা দলে দুশ্চিন্তা।

কাতারের রক্ষণভেদ্য দেৱাল এখন ভঙ্গুর। ৩৮ বছরের ওতামেন্দির ভুল বাড়ছে। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো টটেনহামে বিপর্যয় ডেকে এনেছেন।

লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও গনসালো মন্তিয়েল ইনজুরি। নাহুয়েল মলিনা ভরসা। তালিয়াফিকো ও আকুনিয়া পেছনে। মার্তিনেজও ভুল করছেন।

তবু দল আর্জেন্টিনা। উত্তর আমেরিকার গরমে মানিয়ে নেবে। কিন্তু স্পেন ও ফ্রান্স অনেক এগিয়ে। তাদের গভীরতা বেশি। আর্জেন্টিনার ছন্দ ফিরছে না। এ নড়বড়ে তরিতে পাড়ি দেওয়া অলৌকিকতার আশা।

মেসির পায়ে কি এখনো সেই অলৌকিকতা আছে?

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬: কোথায় থাকবে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স ও স্পেন