সম্প্রতি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের এক মন্তব্য বিশ্বব্যাপী আলোচনার সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা ইরানিদের সঙ্গে জুজুৎসু কৌশল ব্যবহার করছি।’ জুজুৎসু জাপানের ঐতিহ্যবাহী মার্শাল আর্ট, যেখানে নিজের শক্তির পরিবর্তে প্রতিপক্ষের গতি ও বলকেই তার বিরুদ্ধে কাজে লাগিয়ে পরাজিত করা হয়।

মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি ইরানের প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এতে একটি সরকারের হাতে শত শত কোটি ডলার চলে যাওয়ার পথ সুগম হয়েছে, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি যুদ্ধে জড়িত। বেসেন্টের যুক্তি অনুসারে, আমেরিকা ইরানের নিজস্ব সম্পদকেই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র করে তুলছে। ইরানের লক্ষ্য ছিল বিশ্ববাজারে তেলের দাম এতটা বাড়ানো যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিছু হটতে বাধ্য হন। আমেরিকার পাল্টা কৌশল হলো ইরানি তেলের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করে দাম কমানো।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করা হলেও গত কয়েক সপ্তাহে ওই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। এখন ইরান সেখানে অঘোষিত ‘দ্বাররক্ষক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নিরাপদ পারাপারের নিশ্চয়তা দিয়ে তারা এখন বড় অঙ্কের টোল দাবি করছে।

এই দ্বিপক্ষীয় লড়াইয়ে প্রকৃত ‘জুজুৎসু’ কে খেলছে? বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয়, ইরানই এখানে সফল। ১৯৯৫ সালের পর প্রথমবার তেহরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে তেল বিক্রি করার এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পেয়েছে।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখে ইরান এমন অভাবনীয় ছাড় আদায় করেছে, যা ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। মজার বিষয়, আমেরিকা যে কৌশলে দীর্ঘদিন বিশ্ব অর্থনীতিকে ভূরাজনৈতিক লক্ষ্যে অস্ত্র করে আসছে, ইরান সেই একই কৌশলে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

এই কৌশলের উৎস ২০ বছর আগের এক মার্কিন সিদ্ধান্তে। ২০০৪ সালে পুনর্নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে নিষেধাজ্ঞার ভারে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর প্রভাব হারিয়েছে। দীর্ঘ অবরোধে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের প্রত্যক্ষ বাণিজ্য বা বিনিয়োগের কোনো সুযোগ ছিল না। তখন ওয়াশিংটন নতুন পথ খুঁজছিল।

তৎকালীন মার্কিন অর্থ প্রতিমন্ত্রী স্টুয়ার্ট লেভে এক অভিনব উপায় বের করেন। তিনি বুঝলেন, ইরানকে একঘরে করতে অন্য দেশের সরকারগুলোকে রাজি করানোর দরকার নেই; বিশ্বের বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে ভয় দেখালেই চলবে। ব্যাংকগুলোকে হুমকি দেওয়া হয় যে ইরানের সঙ্গে লেনদেন চালালে তারা মার্কিন ডলার ব্যবহারের অধিকার হারাবে।

এই কৌশলকে বলা হয় ‘বানরকে ভয় দেখাতে মুরগি জবাই করা’। ওয়াশিংটন সারা বিশ্বে এটি প্রয়োগের বদলে মাত্র দু-একটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েছিল। এক চীনা ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর বিশ্বের সব বড় ব্যাংক ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

এখন ইরান ঠিক এই আমেরিকান মডেলই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। একসময় মনে করা হতো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে হাজার হাজার সামুদ্রিক মাইন লাগবে। কিন্তু তেহরান দেখিয়েছে, তা নয়।

কম খরচে সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মাত্র কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা পুরো বিশ্বের জাহাজ চলাচলের হিসাব বদলে দিয়েছে। প্রতিটি জাহাজে হামলা করার দরকার ছিল না; অল্প কয়েকটি ঘটনাই বিমা কোম্পানি ও জাহাজমালিকদের মনে আতঙ্ক ছড়াতে যথেষ্ট ছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করা হলেও গত কয়েক সপ্তাহে ওই জলপথে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। এখন ইরান সেখানে অঘোষিত ‘দ্বাররক্ষক’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নিরাপদ পারাপারের নিশ্চয়তা দিয়ে তারা এখন বড় অঙ্কের টোল দাবি করছে।

ট্রাম্পের লক্ষ্য যাই হোক না কেন, এখন তার প্রধান অগ্রাধিকার হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা। কিন্তু ইতিহাস বলে, ঝুঁকি কমানোর চেয়ে বাড়ানো সহজ। ২০১৫ সালের চুক্তির পর বৈশ্বিক ব্যাংকগুলোকে ইরানের সঙ্গে লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হলেও এইচএসবিসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আগের অবস্থায় ফেরেনি। তারা মনে করেছে, ঝুঁকি এখনো রয়েছে।

ইরান এখন সেই ভয়কে পুঁজি করছে। তাদের ড্রোনপ্রযুক্তি সস্তা ও সহজলভ্য। অস্থিরতা কমলেও ইরান যেকোনো সময় জলপথ রুদ্ধ করতে পারে—এই স্থায়ী ভীতি বিশ্ববাজারে থেকে যাবে। এতে বিনিয়োগ ব্যাহত হবে এবং জ্বালানির দাম বাড়বে।

তেহরান ভালো করেই জানে আমেরিকার কূটনৈতিক অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। তারা বেসরকারি পক্ষগুলোকে ইরানের হয়ে দরকষাকষিতে বাধ্য করেছে। এই রণকৌশলে ইরান এখন পর্যন্ত সফল। তারা যে সুযোগ আদায় করেছে, তা বছরের পর বছর কূটনৈতিক আলোচনায় সম্ভব ছিল না।

শঙ্কার বিষয়, অন্য দেশগুলো যদি এই পথ অনুসরণ করে, তবে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা কঠিন হবে। আলোচনার টেবিল এড়িয়ে সবাই লড়াইয়ের মাধ্যমে ছাড় আদায় করলে, শান্তি ফিরিয়ে আনতে বিশ্বকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।

  • এডওয়ার্ড ফিশম্যান পরিচালক এবং সিনিয়র ফেলো কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের গ্রিনবার্গ সেন্টার ফর জিওইকোনমিক স্টাডিজ

    নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত