ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কথা উঠলেই আমরা সাধারণত ডিটারেন্স, সামরিক চাপ, ক্ষেপণাস্ত্র, পরমাণু ঝুঁকি—এই ধরনের কিছু পরিচিত শব্দ শুনি। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু শুধু এই ভাষায় পুরো ছবিটা বোঝা যায় না।

আসলে ইরান কীভাবে লড়ছে এবং তার চেয়েও বড় কথা কীভাবে টিকে আছে, তা বুঝতে হলে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি বিশ্বাসের জগতে প্রবেশ করতে হবে। কারণ এই রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়, এর ভিত্তি শিয়া ধর্মতত্ত্বের এক বিশেষ ধারণা—শহীদি, আত্মত্যাগ এবং ‘পবিত্র প্রতিরোধ’—এর ওপর নির্মিত।

যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না, এটি গল্প এবং বিশ্বাস দিয়ে হয়; মানুষকে কীভাবে বোঝানো হচ্ছে সেটাই এর অন্যতম অংশ। কোনো ইহুদিরাষ্ট্র ৮০ বছর টেকে না—যে ভয়ে ভীত ইসরায়েল।

পবিত্র রমজান মাসে হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে যে দৃশ্য তৈরি হয়েছে, তা বোঝা জরুরি। সেখানে টানা শোক প্রকাশের অনুষ্ঠান চলছে, বোমা পড়ছে, তবু শোক থামছে না। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুগতদের একটা বড় অংশ (বিশেষ করে বাসিজ বাহিনীর সদস্যরা) এখনো মনে করেন, তাঁরা এক ‘ঐশ্বরিক’ শাসনব্যবস্থার জন্য লড়ছেন। এ কারণে তাঁরা প্রয়োজনে প্রাণ দিতেও প্রস্তুত।

এখানে একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। অনেকেই ভাবেন, বাইরে থেকে যত বেশি চাপ দেওয়া হবে, ততই এই রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়বে। বাস্তবে কখনো কখনো উল্টোটা ঘটে। বাইরের আঘাত কখনো কখনো এই ব্যবস্থার পুরোনো শক্তিকেই জাগিয়ে তোলে, যা এতদিন তাকে টিকিয়ে রেখেছে। মৃত্যু–উপত্যকার মুখে আবারও কি ‘ভুল’ করছে পেন্টাগন।

এই শক্তির বড় উৎস শিয়া ইতিহাসের এক গভীর স্মৃতি—৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের কারবালার যুদ্ধ। সেখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাতি ইমাম হোসেন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শহীদ হন। এই ঘটনা শুধু ইতিহাস নয়, এটি একটি প্রতীক—অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই, কষ্টের মধ্যে সত্যের পাশে থাকা এবং প্রয়োজনে আত্মত্যাগের প্রতীক।

এই কারণেই ‘শহীদি’ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের রাজনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজেদের দেখাতে চায় এমন একটা ‘ন্যায়ের পক্ষে থাকা রাষ্ট্র’ হিসেবে, যে রাষ্ট্রটি সাম্রাজ্যবাদ, অপমান এবং বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে।

অনেক ইরানি আছেন, যাঁরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে পছন্দ করেন না। কিন্তু বিদেশি হামলা দেখলে তাঁরাও ক্ষুব্ধ হন। তখন বিষয়টা আর শুধু সরকার বনাম জনগণ থাকে না—বরং হয়ে যায় ‘দেশ বনাম বাইরের শক্তি’। আর এই জায়গাটাই রাষ্ট্র সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে।

সমস্যাটা এখানে—যে রাষ্ট্র আত্মত্যাগকে এত গুরুত্ব দেয়, তাকে আঘাত করলে সেই আঘাত উল্টো তার শক্তি হয়ে উঠতে পারে। বাইরে থেকে যা ধ্বংস মনে হয়, ভেতরে তা ‘ত্যাগ’, ‘সহনশীলতা’, ‘বিশ্বাসের প্রমাণ’ হয়ে ওঠে। এমনকি মৃত্যু। মৃত্যুও সেখানে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

বর্তমানে ইরানের কৌশলও এমনই—সহ্য করে যাওয়া, সময় নিয়ে লড়াই, শত্রুকে ক্লান্ত করা। এবং ভরসা যে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের ধৈর্য আগে ফুরাবে।

এখানে জাতীয়তাবোধও কাজ করে। অনেক ইরানি আছেন, যাঁরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে পছন্দ করেন না। কিন্তু বিদেশি হামলা দেখলে তাঁরাও ক্ষুব্ধ হন। তখন বিষয়টা ‘দেশ বনাম বাইরের শক্তি’ হয়ে যায়। এবং রাষ্ট্র এই সুযোগ সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগায়। ইরান যুদ্ধে ক্লজউইটজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুল।

শান্তির সময় এই সরকারের দুর্বলতা স্পষ্ট—দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক সমস্যা। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে ছবি বদলে যায়। তখন তারা নিজেদের ‘দেশরক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরে।

এটা ঠিক, সবাই এই গল্পে বিশ্বাস করে না। ইরানের ভেতরে অসন্তোষ আছে, সমর্থন কমছে। কিন্তু একটা রাজনৈতিক ধারণা টিকে থাকতে সবার বিশ্বাস দরকার হয় না। দরকার কিছু বিশ্বাসী মানুষ, কিছু প্রতিষ্ঠান, কিছু ভয় এবং চলমান সংঘাত।

এই কারণেই বর্তমান যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেও বিপজ্জনক। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ভেঙে ফেলবে মনে করে, তাহলে তারা হয়তো ভুল হিসাব করছে।

ধর্মীয় দিক গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধ শুধু ধর্মের জন্য নয়। কিন্তু ধর্ম এমন ভাষা দেয়, যার মাধ্যমে কষ্টকে রাজনৈতিক অর্থে রূপায়িত করা যায়।

  • হোসেইন দাব্বাঘ নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি লন্ডন-এর দর্শনের সহকারী অধ্যাপক

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ