ব্যবসাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত রাখতে হলে আমাদের হিসাবরক্ষক বা সেই নীরব প্রহরীদের ক্ষমতায়ন অপরিহার্য, যাঁরা জটিল ব্যবসায়িক পরিবেশকে স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও সহজ করে তোলার দায়িত্ব পালন করেন।
আজকের বিশ্বে আমরা এক অভূতপূর্ব অনিশ্চয়তার সম্মুখীন, যার মূলে রয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলার বিঘ্ন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সাইবার হুমকি, অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন। এসব বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে অর্থনীতিবিদ, আর্থিক বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের মতামত আমরা শুনেছি।
এই লেখায় হিসাবরক্ষকদের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আধুনিককালে তারা কেবল হিসাব রক্ষাকারী নন, বরং সংকটময়কারী, সমস্যা সমাধানকারী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রক, স্থিতিশীলতার স্রষ্টা এবং ধাক্কা সামলানোর শক্তি হিসেবে গণ্য হন।
সংকটের মুহূর্তে হিসাবরক্ষকরাই ভারসাম্য বজায় রাখেন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেন এবং বাস্তবসম্মত সমাধান প্রস্তাব করেন। এতে তারা সমন্বয়, অভিযোজন, সমন্বয় সাধন ও সংশোধনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন। তারাই প্রকৃত ‘বাস্তবতা যাচাইকারী’, যাঁরা নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্যকে বাস্তবে রূপান্তরিত করেন।
অস্থিরতা ও জটিলতার এই যুগে হিসাবরক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত—পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা, বিষয়গুলো স্পষ্ট করা এবং জটিলতা হ্রাস করা। কিন্তু এ দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁদের নিজেদেরও পরিবর্তন করতে হবে। তাঁদের ভিত্তি, ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে দক্ষ সমাধান দিতে পারেন।
তাহলে সংকট মোকাবিলায় হিসাবরক্ষকরা কীভাবে নিজেদের সবচেয়ে ভালোভাবে প্রস্তুত করবেন?
অনেক ক্ষেত্রে এখনো হিসাবরক্ষণ হাতে-কলমে চলে, যা ভুল, অসঙ্গতি এবং বিধি লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে তথ্যপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে বাধা পড়ে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলো এবং ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় দ্রুত রূপান্তর জরুরি।
এতে দূরবর্তী নেতৃত্ব সহজে তথ্য পাবেন, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বারবার যেতে হবে না। হিসাবসংক্রান্ত তথ্য যেকোনো সময় যেকোনো স্থান থেকে পাওয়া যাবে।
অনলাইনভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এর কার্যকর সমাধান।
স্বয়ংক্রিয় ও অনলাইন পদ্ধতি গ্রহণ করলে হিসাব খাত বৈশ্বিক ধাক্কা সামলাতে সক্ষম হবে, পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইবে। তথ্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত থাকবে।
হিসাবরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর ব্যবস্থাপনা। করকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য ছাড়া এটি পূর্ণাঙ্গ হয় না।
কর নীতিনির্ধারক ও হিসাবরক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় জরুরি, যাতে হিসাব তথ্য সহজে কর তথ্যে রূপান্তরিত হয়।
হিসাব নীতিমালা ও করনীতির মধ্যে বড় পার্থক্য থাকা উচিত নয়। এই সমন্বয় বাড়লে সংকটে হিসাবরক্ষকরা আরও কার্যকর স্থিতিশীলতা আনতে পারবেন।
আন্তর্জাতিক হিসাবমানের মধ্যেও সামঞ্জস্য বাড়াতে হবে। মান যত একীভূত হবে, স্থিতিশীলতা তত নিশ্চিত হবে এবং হিসাবরক্ষকরা সংকট মোকাবিলায় দক্ষ হবেন।
হিসাবরক্ষকরা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সতর্ক ও সংযমী। আর্থিক ব্যবস্থাপকরা যেখানে বিনিয়োগ-মুনাফায় মন দেন, সেখানে তারা ভবিষ্যতের সঞ্চয়ে আগ্রহী।
বর্তমানে এই সংযমী মনোভাব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন হিসাবরক্ষকদের পরামর্শ শোনা এবং তা বাস্তবায়নের সময়।
অন্য পেশাজীবীদের সঙ্গে মতপার্থক্য কমাতে হবে এবং হিসাবরক্ষকদের হস্তক্ষেপ ও সমাধানের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বৈশ্বিক সংকট বহুমাত্রিক। হিসাবরক্ষকরা শুধু হিসাব-করে সীমাবদ্ধ থাকতে পারবেন না; প্রযুক্তি, অর্থনীতি, আর্থিক বিশ্লেষণে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সংকট নিরসনে এটি অপরিহার্য।
অনেক প্রতিষ্ঠান হিসাবরক্ষকদের গৌণ মনে করে, কিন্তু তারাই ঝুঁকি আগে শনাক্ত করেন এবং নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠান রক্ষা করেন।
অতএব ব্যবসাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে এই নীরব প্রহরীদের ক্ষমতায়ন জরুরি। তাঁদেরও যুগের সঙ্গে তাল মিলাতে হবে।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও চেয়ারম্যান, ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড
মতামত লেখকের নিজস্ব






