২০০৭ সালের গ্রীষ্মকাল। দুরু দুরু বুকে এসি মিলানের ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করলেন ১৭ বছর বয়সী এক ব্রাজিলিয়ান কিশোর। নাম আলেকজান্দ্রে পাতো।
নিউইয়র্কের এক ক্যাফেতে দ্য অ্যাথলেটিকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় পাতো ফিরে যান ১৯ বছর আগের সেই মুহূর্তে। ‘ড্রেসিংরুমে আমার ডান দিকে বসা পাওলো মালদিনি। সামনে তাকাতেই দেখি কাকা ও রোনালদো। পুরো দলটাই তো কিংবদন্তিতে ঠাসা। যাঁদের নিয়ে সারা জীবন প্লে-স্টেশনে খেলেছি, তাঁরাই তখন আমার রক্ত-মাংসের সতীর্থ!’
মিলানের মেডিকেল সেন্টারে পাতোর সঙ্গে দেখা করতে এলেন কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে গেলেন ক্লাবের ডাইনিং হলে। সেই ঘরে তখন তারার মেলা। মাত্র দুই মাস আগেই এই দলটি জিতেছে চ্যাম্পিয়নস লিগে সপ্তম শিরোপা। নেস্তা, মালদিনি, পিরলো, সিডর্ফ, গাত্তুসো থেকে শুরু করে ইনজাগি আর রোনালদো নাজারিও—কে নেই সেখানে! কাকা তো সে বছরই জিতলেন ব্যালন ডি’অর।
পাতোর চোখে তখন বিস্ময়, ‘আনচেলত্তি আমাকে দেখেই সবাইকে দাঁড়াতে বললেন। একে একে সব মহাতারকা এসে আমাকে স্বাগত জানালেন। বুঝলাম, একেই বলে সম্মান। আপনি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হতে পারেন, কিন্তু আপনাকে বিনয়ী হতে হবে।’ পাতো এখনো মনে করেন, মিলানে ফুটবল শুধু খেলা ছিল না, দলটা ছিল একটা পরিবারের মতো। আর সেই পারিবারিক বন্ধনই তাদের সব জিতিয়েছিল।
কিন্তু পাতো মিলানের সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি। একসময়ের ব্রাজিলিয়ান সেনসেশন ক্যারিয়ার জুড়ে চোটে ভুগেছেন। বিশেষ করে হ্যামস্ট্রিং চোট তাঁর অগ্রযাত্রায় বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যারিয়ারে ৫০০ ম্যাচে ১৮৯ গোল, পরিসংখ্যানটা একেবারে খারাপ নয়। কিন্তু ১৭ বছরের সেই কিশোরকে ঘিরে যে আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা ছিল, তার ধারেকাছেও যাননি। মিলানে ছয় বছর কাটিয়েছেন। ২০১০-১১ মৌসুমে সিরি ‘আ’ জয়ী দলে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন—১৪ গোল। চেলসি, ভিয়ারিয়ালে ব্যর্থ হয়ে চীনেও খেলতে যেতে হয়েছে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে ফিরেছেন সাও পাওলোতে। কোথাও আসলে ওই অর্থে আলো ছড়াতে পারেননি।
এখন পাতোর বয়স ৩৬। ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন তিন বছর আগে। কিন্তু শিশুসুলভ হাসি আর চোখের চঞ্চলতা এখনো আগের মতো। কথা বললেন এখনকার ফুটবল নিয়ে। ডেটানির্ভর ফুটবল ও কোচিংয়ের এই যুগে রোনালদিনহো বা রোনালদোর মতো শিল্পীরা কীভাবে মানিয়ে নিতেন? পাতোর হাসি উত্তর, ‘আপনি কি রোনালদিনহোকে বলতে পারতেন—এই রনি, প্রতিপক্ষের ৮ নম্বর খেলোয়াড়কে মার্ক করো? ও তো হেসেই উড়িয়ে দিত! রোনালদোকে যদি বলতেন ডিফেন্ডারদের প্রেসিং করতে, ও বলত—তোমরা বল কেড়ে আমাকে দাও, বাকিটা আমি দেখছি।’
সম্প্রতি মিলানের দূত হয়ে নিউইয়র্ক ঘুরে এসেছেন পাতো। হাজারো শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছেন। হার্লেমের সাকসেস একাডেমিতেও গেছেন, যেখানে ২০২১ সাল থেকে মিলান ফাউন্ডেশন সহায়তা দিচ্ছে। ৬ থেকে ১৮ বছরের ৪৫০ ছেলেমেয়ে পড়ে সেখানে, যাদের ৮৫ শতাংশ স্বল্প আয়ের পরিবার থেকে। জীবনের চড়াই-উতরাই থেকে শিক্ষা নেওয়ার গল্প শোনিয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের।
পাতো বেড়ে উঠেছেন ব্রাজিলের পাতো ব্রাঙ্কোতে। ছোটবেলায় খেলার জন্য বলও ছিল না। আলু বা কমলা নিয়ে ড্রিবলিং করতেন। ১১ বছর বয়সে প্রথম আসল ফুটবল পায়ে নেন এবং ১৭ বছরেই পৌঁছে যান মিলানে।
মাঝের গল্প রোমাঞ্চকর। টিনেজার বয়সে ঘর ছেড়ে ইন্টারনাসিওনালে যোগ দেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে পালমেইরাসের বিপক্ষে অভিষেক, মাঠে নামার এক মিনিটের মাথায় গোল! তারপর জাপানে ক্লাব বিশ্বকাপে মিসরের আল আহলিকে হারানো, বার্সেলোনার বিপক্ষে ফাইনাল। চ্যাম্পিয়নের ট্রফি নিয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন, সঙ্গে বোনাস—রোনালদিনহোর বার্সা জার্সি!
কয়েক মাসের মধ্যে ব্রাজিলের ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ। প্লাকার লিখল—‘ব্রাজিলীয় ফুটবলের নতুন সেনসেশন’। চেলসি, আর্সেনাল, লিভারপুল, বার্সেলোনা, জুভেন্টাস, ইন্টার—কত ক্লাব আগ্রহ দেখায়। কিন্তু পাতো বেছে নেন মিলান। কারণ রোনালদোর প্রতি ভালোবাসা।
ব্রাজিলে কেউ ভালো খেললেই তকমা জোটে—‘নতুন পেলে’ বা ‘নতুন রোনালদো’। মিলানে যোগ দিয়ে পাতোকেও শোনা যায়—‘এই হলো পরের রোনালদো।’ দ্য অ্যাথলেটিকের সঙ্গে গল্পে বললেন, ‘আমি কখনোই নিজেকে নতুন রোনালদো ভাবিনি। শুধু মনে হতো, ভালোবাসা থেকে খেলছি। আর পাশে বিশ্বের সেরারা আছেন। ব্রাজিলে কেউ একটু ভালো খেললেই বলে, ওই দেখো, নতুন কেউ এসে গেছে। এটা চাপ নয়, এটা স্বাভাবিক।’
মাঠের বাইরেও আলোচনায় ছিলেন পাতো। একজন ব্রাজিলিয়ান অভিনেত্রীকে বিয়ে করেন, রিসেপশন হয় রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা প্যালেসে। কিন্তু সম্পর্ক টেকেনি। পরে প্রেম হয় ইতালির তখনকার প্রধানমন্ত্রী ও মিলানের মালিক সিলভিও বের্লুসকোনির মেয়ে বারবারা বের্লুসকোনির সঙ্গে। আড়াই বছর টিকেছে সেই প্রেম।
মাঠের বাইরের রঙিন জীবন আর চোট—দুইয়ে পাতোর ক্যারিয়ারের ছন্দপতন ঘটে। মিলানে থাকতেই ১৬ বার চোট পান। ‘মানুষ শুধু ম্যাচটা দেখে, সুস্থ হওয়ার দীর্ঘ লড়াইটা অজানাই থেকে যায়। বারবার চোটে পড়ে একসময় নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম’, আক্ষেপ পাতোর কণ্ঠে। এখন তিনি উত্তরসূরিদের সচেতন করতে চান। চুক্তিপত্র বোঝা, নিজের ব্যাংক–ব্যালান্সের খবর রাখা বা এজেন্টকে চেনা—সবই তাঁর চোখে জরুরি।
ফুটবলের বদল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পাতো যেন নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে ফিরে যান। ২০১৮ সালে পিরলোর বিদায়ী ম্যাচে টট্টি, দেল পিয়েরো, তেভেজদের সঙ্গে খেলেন। পাতো বললেন, ‘সেই ফুটবল ছিল ধ্রুপদি সংগীতের মতো। আর এখনকার ফুটবল যেন শুধুই ধুপধাপ শব্দ! এখন মাঠে নাম্বার টেন ভূমিকায় কোনো খেলোয়াড়ই তো নেই। শুধু প্রতিভা দিয়ে এখন আর টিকে থাকা সম্ভব নয়, এখনকার খেলা অনেক বেশি শারীরিক। কোচের কথা না শুনলে দলের বাইরে।’
সামনে বিশ্বকাপ। ব্রাজিলিয়ান টিভি নেটওয়ার্ক এসবিটির হয়ে ধারাবাহিক কমেন্ট্রি করবেন পাতো। ব্রাজিলের ডাগআউটে থাকবেন প্রিয় কোচ ও বন্ধু কার্লো আনচেলত্তি। পাতোর ব্রাজিল নিয়ে আশা, ‘কার্লো জানেন তারকাদের কীভাবে সামলাতে হয়। ব্রাজিলের জন্য তিনিই সঠিক মানুষ।’
তবে নেইমার প্রশ্নে থেমে যান। বাস্তববাদী কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বন্ধু নেইমারকে ভালোবাসি। তবে এটা কার্লোর চেয়ে ওর নিজের ওপর বেশি নির্ভর করছে। বিশ্বকাপের আগে শতভাগ ফিট হওয়ার সময় আছে। কিন্তু ব্রাজিলে খেলাটা সহজ নয়।’ নেইমার না থাকলে রাফিনিয়া, ভিনিসিয়ুস আর কুনিয়ার ওপর ভরসা।
ব্রাজিল কি শৈল্পিক ফুটবল ছেড়ে ইতালিয়ান রক্ষণাত্মক স্টাইলে ঝুঁকবে? পাতোর উত্তর, ‘নতুন প্রজন্মের সমর্থকেরা বোঝে যে এখন আর রূপকথার ফুটবল সম্ভব নয়। খারাপ খেলো, তবু জেতো—এটাই এখন ব্রাজিলের চাওয়া। আমরা শুধু চাই ব্রাজিল ফাইনালে পৌঁছাক।’
ফুটবল মাঠে অনেক কিছু পাননি পাতো—বিশ্বকাপের মঞ্চ, কিংবদন্তির তকমা। কিন্তু যা পেয়েছেন, তার মূল্য ট্রফিতে মাপা যায় না। নিজেকে চিনতে শিখেছেন। এটুকুই তাঁর কাছে যথেষ্ট।






