উত্তরাঞ্চলের শস্যভান্ডার রাজশাহীতে এবারও আলুর ফলন আশাব্যঞ্জক হয়েছে, কিন্তু কৃষকদের মুখে হাসি নেই। লাভের উৎস হওয়ার কথা ছিল যে আলু, বস্তাসংকটের কৃত্রিম জাঁতায় পড়ে তা চাষিদের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। গত বুধবার ১৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছিল আলু, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় তার দাম নেমে এলো ১৩ টাকায়। এই দামহ্রাসের সঙ্গে আলুর মান বা চাহিদা-জোগানের কোনো যোগ নেই; দায়ী হয়েছে চটের বস্তার অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধি।

গত বছরের তুলনায় আলুর বস্তার দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। যে বস্তা গত বছর ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম ১৯৫ টাকায় পৌঁছেছে। এই মূল্যসূচকের ব্যাখ্যা সাধারণ বাজারের চাহিদা দিয়ে সম্ভব নয়। চাষি ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারমালিক ও বড় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের দিকে আঙুল তুলছেন। অভিযোগ, একটি গোষ্ঠী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে একদিকে বস্তার দাম বাড়িয়ে লাভবান হচ্ছে, অন্যদিকে আলু কেনার লোক কমিয়ে মাঠস্তরে দাম পতন ঘটাচ্ছে।

তানোরের চাষিদের আর্তনাদ এই সংকটের ভয়াবহতা প্রমাণ করে। বিক্রি না হওয়ায় তারা বাড়ির পাশে আলুর স্তূপ রেখেছেন বৃষ্টির আশঙ্কায়। আগে ১৫-১৬ টাকা দরে অগ্রিম বায়না দিয়ে থাকা ব্যবসায়ীরা এখন 'বস্তা নেই' অজুহাতে টাকা ফেরত নিতে রাজি নন। ফলে চাষিরা নামমাত্র দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি কৃষকের ওপর সরাসরি অত্যাচার।

হিমাগার মালিক সমিতি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পাটের দামবৃদ্ধি বা কলকারখানা বন্ধের কথা বললেও তা যুক্তিসঙ্গত নয়। পাটের দাম বাড়লে বস্তার দাম কিছুটা বাড়তে পারে, কিন্তু এক বছরে আড়াই গুণ বৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়সারা বক্তব্যও হতাশাজনক।

আমরা চাই, স্থানীয় প্রশাসন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবিলম্বে বস্তাসংকটের রহস্য উদঘাটনের জন্য মাঠে নামুক। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী হিমাগারমালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে সরকারিভাবে সুলভ দামে বস্তা সরবরাহ করতে হবে। কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য না পান এবং বস্তার মতো সাধারণ জিনিসের কাছে আটকে পড়েন, তাহলে ভবিষ্যতে আলু চাষ ত্যাগ করবেন। তার ফলে দেশের সাধারণ ভোক্তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।

আলুর এই স্তূপ যেন কৃষকের দীর্ঘশ্বাসের কারণ না হয়, সেদিকে এখন নজর দেওয়া সময়ের দাবি।