লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পথে মারা যাওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১০ জন সুনামগঞ্জের। তাঁদের লাশ ভূমধ্যসাগরেই ফেলে দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের গ্রিসের একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।
গ্রিসের এই ক্যাম্পে থাকা হবিগঞ্জের এক যুবক মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, খাবার ও খাওয়ার পানির সংকটেই তারা মারা যান। নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক এই যুবক গতকাল শনিবার রাতে মুঠোফোনে কথা বলেন। তিনি নিজেও ৬ মার্চ লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে পৌঁছে ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। ২৭ মার্চ সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের এই ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।
যুবকটি বলেন, গতকাল তিনি আহতদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা সুস্থ। নৌকাটি পথ হারিয়ে ছয় দিন ধরে সাগরে ভাসমান ছিল। এ সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেকে মারা যান। মৃতদের বেশিরভাগই সুনামগঞ্জের, তবে আহতরা মৃতের সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেননি।
স্থানীয় পরিবার, প্রতিবেশী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পর্যন্ত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। তারা হলেন— দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮); দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম, জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।
জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম তাঁর এলাকার দুজনের মৃত্যু বিষয়টি জানিয়েছেন। রানীগঞ্জ ইউনিয়নের পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম তাঁর ওয়ার্ডে দুজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন। পাইলগাঁও গ্রামের মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তাঁর ভাই মারা গেছেন। দোয়ারাবাজার উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন তাঁর ভাগনের আবু ফাহিমের মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন।
দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য এওর মিয়া মুঠোফোনে জানান, মারা যাওয়া চারজনই তাঁর আত্মীয়। গতকাল বিকেলে ওই বোটে থাকা গ্রামের আবদুল কাহারের ছেলে রোহান আহমদ (২৫) ফোনে বিষয়টি জানিয়েছেন। রোহান আহমদ বলেন, গেমে (বোটে) খাবার ও পানির সংকটে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অনেকে মারা যান। তাঁদের মধ্যে এই চারজনও ছিলেন। পরে তাঁদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
একই গ্রামের বর্তমান ইউপি সদস্য শাহনূর মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রোহানই ফোনে গ্রামের চারজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন। রাবারের বোটে করে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে নেওয়া হয়। এটিকে লোকজন গেম বলে। গেমেই তারা মারা গেছেন। সাহান এহিয়ার বড় ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়া জানান, প্রত্যেকে ১২ লাখ টাকায় গ্রিসে যাওয়ার জন্য দালালের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। গত মাসে তারা বাড়ি থেকে রওনা দেন। লিবিয়ায় গিয়ে অর্ধেক টাকা পরিশোধ করা হয়। কয়েক দিন ধরে তাঁদের খোঁজ ছিল না। আজ বিকেলে চাচাতো ভাই রোহান ফোনে মৃত্যুর খবর জানান।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, “ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার ১০ জন রয়েছেন বলে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তাঁদের নাম–পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।”






