গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে ২০২৪-এর পর থেকে বাংলাদেশের জনপরিসরে একটা লক্ষণীয় প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: কারো বক্তব্যের পুরোটা না বুঝে তার কথার একটা অংশ ছিঁড়ে নিয়ে তাকেই ‘পূর্ণ সত্য’ বলে চালানো। পরিপ্রেক্ষিতকে একপাশে সরিয়ে অর্থ গড়ে তোলা এবং সেই অর্থকে সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা—এগুলো ভাষার রাজনীতির অংশ।
এই প্রক্রিয়ায় ভাষা শুধু তথ্য বহন করে না, বরং বাস্তবতা গড়ে তোলে এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতার সম্পর্কগুলো দৃশ্যমান ও কার্যকর হয়। এই ভাষার রাজনীতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে যখন আলোচনার কেন্দ্রে থাকে একজন নারী, বিশেষ করে যদি তিনি শিক্ষক হন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত, দৃশ্যমান এবং মতামত প্রকাশে সক্রিয়। তখন তাঁকে ‘শিক্ষক’ না বলে ‘শিক্ষিকা’ বলা হয়। এই পার্থক্য ব্যাকরণগত মনে হলেও বাস্তবে এটা সামাজিক চিহ্নায়নের প্রক্রিয়া, যা একজনকে ‘স্বাভাবিক’ এবং অন্যজনকে ‘চিহ্নিত’ করে। এর মাধ্যমে একটা অদৃশ্য সীমারেখা টানা হয়।
জ্ঞান কি লিঙ্গ চেনে? ‘গুরু’ থেকে ‘শিক্ষিকা’—একটি ভাষাগত বিচ্যুতি
এই প্রশ্ন আরও গভীর হয় যখন আমরা নিজেদের ভাষা ও জ্ঞান-ঐতিহ্যের দিকে তাকাই। উপমহাদেশীয় জ্ঞান-সংস্কৃতিতে ‘গুরু’ একটা মৌলিক ধারণা, যা কখনো লিঙ্গভিত্তিক হয়নি। ‘গুরু’ বলতে জ্ঞানদাতা বা পথপ্রদর্শক—এই পরিচয়ই প্রধান; ‘নারী গুরু’ বা ‘পুরুষ গুরু’র জন্য আলাদা ভাষাগত প্রয়োজন ছিল না।
অর্থাৎ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত পরিচয় ঐতিহাসিকভাবে লিঙ্গনিরপেক্ষ ছিল। কিন্তু আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় এসে আমরা এই ঐতিহ্য থেকে সরে পেশাকে লিঙ্গচিহ্নিত করতে শুরু করেছি, যেমন ‘শিক্ষক’ ও ‘শিক্ষিকা’ আলাদা। ফলে প্রশ্নটা শুধু ভাষাগত নয়, এটা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবর্তনেরও—আমরা কি ঐতিহাসিক লিঙ্গনিরপেক্ষ জ্ঞানধারা ধরে রাখতে পারছি, নাকি নতুন বিভাজন তৈরি করছি?
মিডিয়ার ভাষা: সম্বোধনের ভেতরে নির্মিত পার্থক্য
এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিকভাবে পুনরুৎপাদিত হয়, বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমে। সাম্প্রতিককালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে প্রকাশিত শিরোনামগুলোতে দেখা যায়—‘ইবি শিক্ষিকাকে গলা কেটে হত্যা’, ‘ছুরিকাঘাতে আহত ইবি শিক্ষিকা মারা গেছেন’, ‘ইবি শিক্ষিকা হত্যা’। একই ঘটনার বর্ণনায় ধারাবাহিকভাবে লিঙ্গচিহ্নিত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও ‘নারী শিক্ষক’ বলা হয়েছে, কিন্তু ‘শিক্ষক’ প্রায় অনুপস্থিত। এই ভাষা শুধু ঘটনা বর্ণনা করে না, সামাজিক বিন্যাস তৈরি করে, যেখানে ‘শিক্ষক’ অদৃশ্য মানদণ্ড এবং ‘শিক্ষিকা’ চিহ্নিত ব্যতিক্রম। ফলে ভাষা নিরপেক্ষ থাকে না, সক্রিয়ভাবে পার্থক্য তৈরি করে।
ভাষা, লিঙ্গ ও ক্ষমতা
ভাষাতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা এটাকে আরও গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে। ফেমিনিস্ট ল্যাঙ্গুয়েজ রিফর্ম মুভমেন্ট দেখিয়েছে যে ভাষা বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, এটি বাস্তবতা নির্মাণ করে। ব্রিটিশ ভাষাবিজ্ঞানী ডেবোরাহ ক্যামেরন ভাষাকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে দেখিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ান নারীবাদী ডেল স্পেন্ডার যুক্তি দেন, ভাষা ঐতিহাসিকভাবে পুরুষকেন্দ্রিক। মার্কিন দার্শনিক ও জেন্ডার তাত্ত্বিক জুডিথ বাটলার দেখান, ভাষার পুনরাবৃত্তি সামাজিক বাস্তবতা স্থায়ী করে। এই তাত্ত্বিক অবস্থান নীতিগত পর্যায়েও প্রতিফলিত—জাতিসংঘের জেন্ডার অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষা ব্যবহারের জোর তার প্রমাণ।
বাংলাদেশে প্রমিত ভাষা: প্রতিষ্ঠান, নীতি ও লিঙ্গচিহ্নায়ন
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভাষাচর্চা নীতিগত দ্বৈততার মুখোমুখি। বাংলা একাডেমির অভিধান ও প্রমিত ভাষায় ‘শিক্ষক/শিক্ষিকা’, ‘অধ্যাপক/অধ্যাপিকা’র দ্বৈত রূপ স্বীকৃত, যা ভাষায় লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন প্রাতিষ্ঠানিক করে। এই চিহ্নায়ন শিক্ষা, প্রশাসন ও নীতিতে পুনরুৎপাদিত হয়। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিউর ভাষায়, এটা প্রতীকী ক্ষমতার উদাহরণ, যেখানে ভাষা সামাজিক বাস্তবতাকে বৈধ করে এবং প্রতীকী সহিংসতার মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠা করে।
রাজনীতি ও সম্বোধন: অসম্পূর্ণ এক ভাষা-সংস্কার
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষাচর্চাও এই দ্বৈততা থেকে মুক্ত নয়। বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার আত্মপ্রকাশে ‘চেয়ারপারসন’-এর মতো লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করে ভাষাগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা দেখিয়েছিল রাজনীতি চাইলে ভাষা নতুনভাবে গড়তে পারে। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা টিকেনি। ফলে প্রশ্ন: লিঙ্গনিরপেক্ষ ভাষার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা কেন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃত হলো না? এটা ভাষার নয়, রাজনৈতিক ইচ্ছা ও নীতির প্রশ্ন।
শেষ প্রশ্ন: সম্বোধন কি সীমারেখা তৈরি করে?
অতএব, এই আলোচনার উদ্দেশ্য শব্দ নিষিদ্ধ করা নয়, বরং একটা মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরা—ভাষার মাধ্যমে মানুষকে কীভাবে চিহ্নিত করছি এবং সেই চিহ্নিতকরণ কতটা প্রয়োজনীয় বা ন্যায়সংগত। ভাষা চিন্তার কাঠামো গড়ে, নীতি তাকে প্রাতিষ্ঠানিক করে। যে সম্বোধন মানুষকে আলাদা করে, সেটি অদৃশ্য সীমারেখায় পরিণত হয়। তাই প্রশ্ন: মানুষকে জ্ঞান দিয়ে চিনব, নাকি সম্বোধনে সীমাবদ্ধ করব?
ড. রেজওয়ানা করিম
সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব






