শীতের শেষভাগে পরিযায়ী পাখিরা প্রকৃতিকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ঘটেছে এক কলঙ্কজনক ঘটনা। ছয়জনকে ধরা পড়েছে সাত বস্তা মৃত পরিযায়ী পাখি, চারটি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ গুলি নিয়ে। চার মণ ওজনের এই মৃত পাখির স্তূপ দেখে স্থানীয় জনতা শিউরে উঠেছে। এ ঘটনা শুধু বন্য প্রাণী আইনের লঙ্ঘন নয়, বরং আমাদের সমাজের তথাকথিত শিক্ষিত ও প্রভাবশালী শ্রেণির মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতির প্রকাশ।

গজারিয়ার মেঘনার চরাঞ্চলে ট্রলার নিয়ে শিকারে বের হওয়া এই দলের সদস্যদের পরিচয় ও বয়স দেখলে এক ভয়াবহ বৈপরীত্য ধরা পড়ে। সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ থেকে তরুণ—সবাই মিলে মেতে উঠেছিল রক্তক্ষয়ী এই ‘খেলায়’। যে বয়সে প্রকৃতির প্রতি মমতা ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব থাকার কথা, সেই বয়সে তারা নির্বিচারে প্রাণী হত্যায় লিপ্ত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, একদিনেই কয়েক হাজার পাখি মারা গেছে। এই পাখির ‘লাশের মিছিল’ প্রমাণ করে যে, তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র শুধু নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং নিরীহ প্রাণীর রক্ত ঝরিয়ে বিকৃত আনন্দ লাভের মাধ্যম।

উপজেলা প্রশাসন তাদের অপরাধ স্বীকারের ভিত্তিতে অর্থদণ্ড ও অস্ত্র জব্দ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এই নামমাত্র জরিমানা কি প্রকৃত বিচার? বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুসারে বন্য প্রাণী হত্যার শাস্তির কঠোর প্রয়োগ এখানে কতটা হয়েছে, তা ভাবার মতো। অপরাধীদের বয়স বিবেচনা করে দণ্ড শিথিল করা হলেও তারা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে, তার ক্ষতিপূরণ কি কয়েক লাখ টাকায় সম্ভব? প্রতিটি পাখি হত্যার জন্য আলাদা শাস্তি দেওয়া যায়।

গজারিয়ার স্থানীয় জনতা যদি এই শিকারিদের অবরুদ্ধ না করত, তাহলে হয়তো এই ‘ভদ্রবেশী’ ঘাতকরা আইনের ধরাছোঁয়া এড়িয়ে যেত। সাধারণ মানুষের এই সচেতনতা প্রশংসনীয়, কিন্তু রাষ্ট্রের নজরদারি ও বন বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা হতাশাজনক। সাত বস্তা পাখি হত্যা দীর্ঘ সময়ের কাজ, এবং সেই সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজান্তে এটা সম্ভব হওয়া চরম ব্যর্থতা।

জব্দকৃত অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা উচিত। শুধু জরিমানা যথেষ্ট নয়। আইনানুযায়ী জেল-জরিমানাসহ কঠোর শাস্তি প্রয়োজন। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এমন অপরাধ বন্ধ করা অসম্ভব। পাখি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।