‘আশ্রম’ সিরিজে সাহসী ভূমিকায় অভিনয় করে নতুন করে কথায় উঠেছেন ত্রিধা চৌধুরী। বিভিন্ন ভাষার ছবি ও সিরিজে আগেও কাজ করলেও এই ওয়েব সিরিজই তাঁকে বড় দর্শকবৃন্দের কাছে আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছে। মুম্বাইয়ের একটি রেস্তোরাঁয় মুক্তকণ্ঠের মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্যর সঙ্গে একান্তে কথা বলতে গিয়ে তিনি ক্যারিয়ারের শুরু, সংগ্রাম, সাফল্য এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
বাংলা ছবি ‘মিশর রহস্য’-তে সৃজিত মুখার্জির সঙ্গে কাজ করে ত্রিধার অভিনয়জীবনের আগমন। ক্যারিয়ারের শুরুতেই এমন পরিচালকের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে তিনি বড় সৌভাগ্য মনে করেন। তাঁর কথায়, “আমি তখন খুবই ছোট ছিলাম, ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। সৃজিতদার মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করা মানে যেন একজন শিশুকে হাত ধরে পথ দেখানো। উনি আমাকে ভরসা দিতেন, নানাভাবে উৎসাহিত করতেন। উনিই প্রথম বলেছিলেন, অভিনয়ের ক্ষেত্রে ভাষা কখনোই বাধা হতে পারে না।”
অভিনয়ে আগমনের আগে ত্রিধা মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে পড়াশোনা করতেন। পড়াশোনায় ভালো ফল পেলেও সেই লাইনে স্থায়ীভাবে থাকার কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি বলেন, “পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম না, কিন্তু কখনো মনে হয়নি, সারা জীবন এই লাইনে থাকতে চাই। যখন অভিনয়ে আসার সুযোগ এল, তখন ভয় ছিল—টিকে থাকতে পারব তো? লোকে কী ভাববে? কিন্তু এখন মনে হয়, সেটাই ছিল জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত।”
ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। স্কুলের নাটকে অংশ নিতেন। সেই সময়ের স্মৃতি ফিরিয়ে তিনি বলেন, “বাবা ছিলেন আমার প্রথম ফটোগ্রাফার। সিঁদুর–রঙা একটা জামা পরে পোজ দিচ্ছি আর বাবা ক্যামেরা হাতে ছবি তুলছেন—ছবিটার কথা এখনো মনে আছে। বাবা খুব অভিব্যক্তিপূর্ণ, শিল্পীমনস্ক ছিলেন। সেখান থেকেই হয়তো অভিনয়ের বীজটা তৈরি হয়েছিল।”
বাংলা চলচ্চিত্রে শুরু হলেও সেখানে তাঁকে খুব বেশি দেখা যায়নি। এ নিয়ে তাঁর মনে আক্ষেপ রয়েছে। তিনি বলেন, “বাংলা দিয়েই ক্যারিয়ার শুরু, কিন্তু এখানে শুরুতে তেমন সুযোগ পাইনি, যা মুম্বাই আমাকে দিয়েছে। অনেক সময় মনে হয়, ভালো কাজ করার পরও কেন বাংলা আমাকে আমার প্রাপ্য সুযোগ দেয়নি? আমি তো বাংলার মেয়ে। বাংলার প্রতি আমার আবেগ সব সময় আলাদা। তাই ভবিষ্যতে বাংলায় আরও বেশি কাজ করতে চাই।”
মুম্বাইয়ে শুরুর দিনগুলো সহজ ছিল না। নতুন শহরে মানিয়ে নেওয়ার সময় একাকিত্বও তাঁকে তাড়া করেছে। তিনি বলেন, “মুম্বাইয়ে এসে দেখলাম, সবার নিজস্ব একটা গ্রুপ আছে। তাঁদের মধ্যে নিজেকে খুব একা লাগত। অনেক সময় অসহায়ও মনে হতো। চুপচাপ থাকতাম, সবার সঙ্গে মিশতে পারতাম না। সেই কারণে অনেকে আমাকে ভুল বুঝতেন—অহংকারী ভাবতেন। আসলে আমি খুব বেশি সামাজিকও ছিলাম না।”
বড় পর্দায় শেষবার তাঁকে দেখা গেছে কপিল শর্মার ‘কিস কিসকো প্যায়ার করু ২’-এ। তবে ক্যারিয়ারের বড় মোড় এসেছে প্রকাশ ঝার ‘আশ্রম’-এ। এই সিরিজই তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “আশ্রম যেন আমার জীবনকে নতুন করে শুরু করার সুযোগ দিয়েছে। এই সিরিজ আমাকে নতুন করে চিনিয়েছে। প্রকাশ ঝা শুধু পরিচালক নন, উনি আমার গাইড। এখনো কোনো সমস্যায় পড়লে ওনাকে ফোন করি।”
সিরিজে ববি দেওলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়েছে। শুরুতে এতে অস্বস্তি হয়েছিল বলে জানান তিনি, “কোনো অভিনেতার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ দৃশ্য করা সহজ না। তার ওপর ববি দেওলের মতো অভিনেতার সঙ্গে এমন দৃশ্য করা আমার জন্য আরও কঠিন ছিল। ওনার সিনেমা দেখে বড় হয়েছি, উনি আবার ধর্মেন্দ্রর ছেলে—সব মিলিয়ে প্রথম দিকে সংকোচ ছিল। শুধু ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নয়, ওনার সামনে সংলাপ বলতেও চাপ লাগত। তবে উনি খুব সহযোগী ছিলেন, আমাকে স্বচ্ছন্দ করে তুলেছিলেন।”
এখন দক্ষিণ ভারতীয় ও বলিউড উভয় ইন্ডাস্ট্রিতেই কাজ করছেন ত্রিধা। কাজের ধরনে দুই জায়গায় পার্থক্য আছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, “দক্ষিণে কাজ খুব সময় মেনে, খুব পেশাদারত্বের সঙ্গে হয়। বলিউডে অনেক সময় কাজ একটু ঢিলেঢালা হয়, কখনো অব্যবস্থাপনাও দেখা যায়। তবে দুই জায়গাতেই শেখার সুযোগ আছে।”
ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাও ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলেছে। অতীতের সম্পর্ক নিয়ে খোলাখুলি বলেন তিনি, “এখন মনে হয়, আমার আরও বেশি করে অভিনয়ের দিকে মন দেওয়া উচিত ছিল। কোনো একজন কেন আমার জীবন বা ক্যারিয়ারের ওপর এতটা প্রভাব ফেলবে? পেছন ফিরে দেখি, ভালো কাজ করেছি ঠিকই, কিন্তু সংখ্যায় কম। আরও বেশি কাজ করার দিকে ফোকাস করা উচিত ছিল।”
জীবনের চড়াই-উতরাই তাঁকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে করেন ত্রিধা। তিনি বলেন, “এই যাত্রা সহজ ছিল না, কিন্তু প্রতিটা ধাপ আমাকে আরও শক্ত করেছে। এখন মাধ্যম অনেক বেড়েছে, সুযোগও বেশি। তাই সময়টা কাজে লাগাতে চাই। সামনে আরও ভালো কাজ করতে চাই, এটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।”






