মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জাহাজের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সমুদ্রপথের পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানিতে জোর দিচ্ছে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে এবার ৭ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়েছে।

গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় এই জ্বালানি তেল পাইপলাইনে আসা শুরু হয়। সম্পূর্ণ পৌঁছাতে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে। জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘পাইপলাইনে সরবরাহ অব্যাহত আছে। বিকল্প উৎস সচল রাখায় বর্তমানে জ্বালানিসংকটের আশঙ্কা নেই।’

বিপিসি সূত্র জানায়, দেশের কৃষি সেচ, সড়ক পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বেশি। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন বড় প্রভাব ফেলতে পারে। চলতি মাসে ১৭টি জাহাজে দেশে ডিজেল আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত এসেছে ৯টি। একটি জাহাজ পথে রয়েছে। বাকি ৭টির সূচি এখনো অনিশ্চিত।

এই ঘাটতি পূরণে পাইপলাইনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ইতিমধ্যে ভারত থেকে পাইপলাইনে প্রায় ১৫ হাজার টন ডিজেল এসেছে। এর আগে ২৫ মার্চ পাঁচ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়।

বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজের সংকটও তৈরি হয়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে পাইপলাইন তুলনামূলক স্থিতিশীল বিকল্প হয়ে উঠেছে। ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারির সঙ্গে ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর চুক্তি করে বিপিসি। ভারত থেকে ডিজেল আনা সহজ করতে দুই দেশের মধ্যে নির্মাণ করা হয় বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন। ভারতীয় অর্থায়নে নির্মিত প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে চালু হয়। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ডিজেল সরাসরি দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোয় পৌঁছায়। চুক্তি অনুযায়ী, বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের কথা রয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত ৬০ হাজার টন সরবরাহের সুযোগ থাকলেও তা বাধ্যতামূলক নয়।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ভারত থেকে নিয়মিত বিরতিতে তেল আসছে। প্রতিবার পাঁচ হাজার টন করে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। কেননা, পাইপলাইন থেকে খালাসের জন্য দেশের মজুতাগারের সক্ষমতা সীমিত। বিদ্যমান মজুত শেষ না হলে নতুন করে বেশি পরিমাণ তেল আনা যায় না। তবে এখন ট্যাংক থেকে তেল দ্রুত খালাস হওয়ায় ৭ হাজার টন আনা যাচ্ছে। ভারত থেকে পাইপলাইনে প্রতি ব্যারেল (১৫৯ লিটার) ডিজেল পরিবহনে খরচ পড়ে প্রায় সাড়ে ৫ ডলার, যা সমুদ্রপথের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম।

জ্বালানি–বিশ্লেষকেরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ সক্ষমতা না বাড়ালে এই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। এদিকে মাঠপর্যায়ে ইতিমধ্যে কিছু এলাকায় ডিজেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। কৃষি মৌসুম সামনে রেখে সরবরাহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর বড় অংশ সরাসরি আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়। আর বছরে সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ টন পাওয়া যায় অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে।