সিআইডি পল্টন থানার মানব পাচারের যে মামলাকে মিথ্যা উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছিল, সেই মামলাতেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এমনকি গত বছরের ডিসেম্বরে এ মামলার একজন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

মামলার বাদী আলতাব খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আসামিদের সঙ্গে সমঝোতা করে সিআইডি মামলাটিকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করে। মামলার ফলাফল তাঁকে জানানো হয়নি। তিনি মিথ্যা মামলা করেছেন উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে সিআইডি। পরে তিনি বিষয়টি জানতে পেরে আদালতে না রাজি দেন। আদালত মামলাটি পুনঃ তদন্তের জন্য ডিবিকে নির্দেশ দেন। মামলাটি ডিবিতে আসার পরও তেমন গতি পায়নি। তবে মামলার অন্যতম আসামি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করায় এ মামলা নতুন করে গতি পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এ মামলার ৩ নম্বর আসামি। তিনি এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ‎ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। গত সোমবার ঢাকার বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। পরে পল্টন থানার এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। মানব পাচার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলেও এক–এগারোর সময়ে বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়েও মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

.

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিগত সরকারের সময়ে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই চক্রে একজন ক্ষমতাশালী ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সেই চক্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ক্ষমতার উৎস সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মানব পাচার আইনে ঢাকার পল্টন থানায় ১০৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন আফিয়া ওভারসিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আলতাব খান। ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীও এ মামলার আসামি। এ ছাড়া সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন এবং ঢাকা–২০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদও এ মামলার আসামি।

মামলার নথি অনুযায়ী, শুরুতে এ মামলা তদন্ত করে পল্টন থানা–পুলিশ। পরে সিআইডিতে মামলা স্থানান্তরিত হয়। গত বছরের ১৫ জুলাই সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে বলেছে, মামলাটি মিথ্যা। এখন আদালতের নির্দেশে মামলাটি পুনঃ তদন্ত করছে ডিবি।

.

এদিকে মামলাটি ডিবি তদন্ত শুরু করার পর গত বছরের ডিসেম্বের এ মামলার ১২ নম্বর আসামি এস এম রফিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ডিবির একজন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির নামে মানব পাচার ও বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে, সে তথ্য-উপাত্ত উঠে এসেছে।

যদিও সিআইডিতে মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁরা যখন মামলার তদন্তভার পান, তখন ১০৩ জন আসামির মধ্যে ৭৬ জন জামিনে ছিলেন। অন্যরা পলাতক ছিলেন। ফলে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। মামলার বাদীও যথেষ্ট তথ্য–প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। ফলে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। এটি আদালত ডিবিকে পুনঃ তদন্তের জন্য দিয়েছেন। এ মামলার একটি ধারা ছিল পেনাল কোডের। চাঁদাবাজি–সংক্রান্ত। সেই ধারাতেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সেটি আদালত গ্রহণ করেছেন। বাদীকে দুটি মামলার ফলাফলই জানানো হয়েছিল।

.

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রমতে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন এক-এগারোর পটপরিবর্তনের প্রধান উদ্যোক্তা বা মূল কুশীলবদের অন্যতম। তখন তিনি ছিলেন সাভারে অবস্থিত সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি। তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর-ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে মিলে পুরো পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। তখন এমন আলোচনাও ছিল যে তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন; যদিও তিনি পরে ওই পরিকল্পনায় যুক্ত হন।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির দিন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে বঙ্গভবনে যে সেনা কর্মকর্তারা গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীও ছিলেন। তিনি সেদিন বঙ্গভবনে সশস্ত্র অবস্থায় গিয়ে চাপ প্রয়োগ করেন। চাপের মুখে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তখন একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। সেই পদ থেকেও তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।

.মাসুদ উদ্দিন: এক-এগারো, ক্ষমতা, পুরস্কার ও বিতর্ক.

জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা-সমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এরপর মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির (টাস্কফোর্স) সমন্বয়ক হন। এই পদ ছিল সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রশাসনিক অভিযান সমন্বয়-কাঠামোর একটি। এই কমিটির অধীন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, বিশেষ অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। মাসুদ উদ্দিন পরে পদোন্নতি পেয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘এক-এগারো: বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮’ বইয়ে লিখেছেন, সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি নিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছিল, যেখানে কিছু সামরিক কর্মকর্তা নেপথ্যে থেকে রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রশাসনিক সমন্বয় ও অভিযান বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতেন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নামও সেই প্রেক্ষাপটে এসেছে।

এ ছাড়া তখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক দল (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি) গঠনের প্রচেষ্টার নেপথ্যেও তখনকার কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ভূমিকা রেখেছিলেন, যাঁদের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নামও আলোচনায় আসে। তিনি ছিলেন রক্ষীবাহিনীতে। ১৯৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী অবলুপ্ত করে তাদের সেনাবাহিনীতে আত্তীকরণ করা হয়। সেভাবেই মাসুদ উদ্দিন সেনাবাহিনীতে আসেন।

.

এক-এগারো সরকারের সবচেয়ে আলোচিত কার্যক্রম ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। বহু শীর্ষ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিশেষ কারাগার, জিজ্ঞাসাবাদ, রিমান্ড—এসব বিষয় তখন ব্যাপক আলোচনায় আসে।

ওই বিশেষ অভিযান নিয়ে বিতর্কও ছিল। অভিযোগ ওঠে, অনেক গ্রেপ্তারে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, কিছু ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও ছিল। মাসুদ উদ্দিন টাস্কফোর্সের প্রধান ও সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসি থাকা অবস্থায়ই তাঁর বিরুদ্ধে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরে জনপরিসরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বিতর্কিত হয়ে ওঠেন।

একপর্যায়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদের সঙ্গে কিছু বিষয়ে মাসুদ উদ্দিনের মতভেদ দেখা দেয়। এরপর ২০০৮ সালের ২ জুন তাঁর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে দেন মইন উ আহমেদ। এরপর ২ সেপ্টেম্বর তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার তিন দফায় তাঁর চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে। অবসর গ্রহণের পর তিনি ঢাকায় একাধিক ব্যবসায় যুক্ত হন।