১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টা; ঢাকার রাজারবাগে তৎকালীন পুলিশের কেন্দ্রীয় ওয়্যারলেস বেজ স্টেশন থেকে সারা দেশে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের খবরটি দিয়েছিলেন বেতার অপারেটর শাহজাহান মিয়া। সেই বার্তায় তিনি বলেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের সব বেজ স্টেশনকে সতর্ক করা হচ্ছে যে পাক সেনাবাহিনী আমাদের আক্রমণ করেছে। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’
সেই রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকেই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। শাহজাহান মিয়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ভবনের ছাদে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন। গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে ভোরের দিকে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন এবং নির্যাতনের শিকার হন। দুই দিন পর ২৮ মার্চ মুক্তি পেয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
.শাহজাহান মিয়া যে বেতারযন্ত্র দিয়ে ওই বার্তা পাঠিয়েছিলেন, সেটি ‘হেলিকপ্টার ব্যাজ’ মডেলের। ইতিহাসের সাক্ষী এই বেতারযন্ত্র এখন সংরক্ষিত আছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে’। জাদুঘরের দেয়ালে সেই বেতারবার্তা বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
.মুক্তিযুদ্ধের সময় পুলিশের ব্যবহৃত এসএমজি, এলএমজি, মেশিনগান, রাইফেল, রিভলবার, বন্দুক, শটগান, বেয়োনেটসহ নানা ধরনের অস্ত্র জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদানের নানা নিদর্শন রয়েছে এই জাদুঘরে। পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলে ব্যবহৃত পুলিশের বিভিন্ন অস্ত্র ও সরঞ্জামও এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।.
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের প্রাক্কালে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শকের বডিগার্ড আবদুল আলী ‘পাগলা ঘণ্টা’ বাজিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুলিশ সদস্যদের একত্র করেন। তিনি সবাইকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
পাগলা ঘণ্টার আওয়াজ শুনে রাজারবাগে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা সেখানে জড়ো হন। পরে তাঁরা অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সালামি গার্ডে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন এবং প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেন। সেই পাগলা ঘণ্টাও এখন পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
.প্রথম প্রতিরোধ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদানের নানা স্মারক ও স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে এই জাদুঘরে। এসব স্মারক ও স্মৃতিচিহ্নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের প্রথম প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্মারক নিয়েই ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’।
বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ স্মৃতিস্তম্ভের পাশে। স্মৃতিস্তম্ভটির আদলেই জাদুঘর ভবনের নকশা করা হয়। এটি উদ্বোধন করা হয় ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। এর আগে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের টেলিকম ভবনে প্রথম জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়েছিল।
সম্প্রতি পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গেলে অভ্যর্থনা জানান জাদুঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক (এসআই) আহসান হাবীব। তিনি পুরো জাদুঘর এই প্রতিবেদককে ঘুরে দেখান এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র সম্পর্কে নানা তথ্য দেন।
.আহসান হাবীব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পুলিশের ব্যবহৃত এসএমজি, এলএমজি, মেশিনগান, রাইফেল, রিভলবার, বন্দুক, শটগান, টাঙ্গী, বেয়োনেটসহ নানা ধরনের অস্ত্র জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদানের নানা নিদর্শন রয়েছে এই জাদুঘরে। পাশাপাশি ব্রিটিশ আমলে ব্যবহৃত পুলিশের বিভিন্ন অস্ত্র ও সরঞ্জামও এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।
এসআই আহসান হাবীব বলেন, পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি পরিদর্শন করলে মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকা এবং নানা স্মৃতিচিহ্ন সম্পর্কে নানা তথ্য জানা যাবে। নতুন প্রজন্মকে এসব ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং মুক্তিযুদ্ধের নানা নিদর্শন সংরক্ষণের জন্যই জাদুঘরটি স্থাপন করা হয়েছে।
.শহীদ পুলিশ সদস্যদের নানা স্মারক
মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত নানা স্মারক সংরক্ষণ করা হয়েছে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ সুপার শাহ আবদুল মজিদের ব্যবহৃত ব্লেজার ও প্যান্ট। একইভাবে পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মামুন মাহমুদের ইউনিফর্মের বেল্ট ও লাঠিও জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরের দেয়ালজুড়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের যুদ্ধকালীন ডায়েরি, হাতে লেখা বার্তা, আলোকচিত্র ও পোস্টার।
এ ছাড়া আরও অনেক শহীদ পুলিশ সদস্যের ইউনিফর্ম, জামা, বেল্ট, চশমা, লাঠিসহ তাঁদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রী সংগ্রহ করে জাদুঘরে রাখা হয়েছে।
.শুধু শহীদ পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত জিনিসই নয়, মুক্তিযুদ্ধ–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও স্মারকও সংরক্ষণ করা হয়েছে জাদুঘরটিতে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) পদে নিয়োগ পান আবদুল খালেক। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্রসচিবও ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত প্রায় ১৪ হাজার পুলিশ সদস্য কর্মস্থল ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তাঁরা নিজেরা যুদ্ধে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, সংগ্রহ করা এবং সংগঠিত করার কাজেও যুক্ত হন।
পরে পাকিস্তান সরকার মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের কর্মস্থলে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়। সে সময় আইজিপি আবদুল খালেক একটি চিঠির মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার আহ্বান জানান। ঐতিহাসিক সেই চিঠিও সংরক্ষিত আছে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।
দেয়ালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার ইতিহাস
পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শনের সময় দেয়ালে সাঁটানো একটি লেখায় চোখ পড়ল। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের ইতিহাস লেখা রয়েছে। লেখার শিরোনাম– ‘প্রথম প্রতিরোধ: রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ২৫ মার্চ ১৯৭১’। সেখানে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’–এর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রমণ করে। পুলিশ লাইনসে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগার ভেঙে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য অবস্থান নেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শান্তিনগর, মালিবাগ ও ফকিরাপুল—তিন দিক থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আক্রমণের পরিকল্পনা করে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাদের একটি গাড়িবহর শান্তিনগরে এস পৌঁছায়। গাড়ি থেকে নামতেই ডন স্কুলের (বর্তমান ইস্টার্ন প্লাস শপিং মল) ওপর থেকে পুলিশের প্রথম বুলেটটি আঘাত করে এক পাকিস্তানি সৈনিককে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই সৈনিক। ডন স্কুলের ওপর থেকে ছোড়া সেই বুলেটই ছিল স্বাধীনতার সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম বুলেট।
.শেষ রাতে পুলিশের গোলাবারুদ ফুরিয়ে গেলে পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ দখল করে নেয়। মর্টার শেলের আঘাতে বিধ্বস্ত পুলিশ লাইনসের টিনশেড ব্যারাকগুলো আগুনে পুড়ে যায়। পাকিস্তানি বাহিনী পুলিশ লাইনসে ব্যাপক লুটপাট করে এবং নারীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন করে। আটকে পড়া পুলিশ সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করে এবং লাশ বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
জাদুঘরের দেয়ালে যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফের একটি প্রতিবেদন থেকে এই বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগে শহীদ হওয়া পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা উল্লেখ করা না হলেও খুব বেশি পুলিশ সদস্য সেদিন বেঁচে ফিরতে পারেননি।
.দেয়ালে রমনা থানা, বংশাল থানা, বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ি, কোতোয়ালি থানায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ ও বর্বরতার ইতিহাস তুলে ধরা হয়। দেয়ালে একটি লেখার দিকে চোখ আটকে যায়। সেই লেখার শিরোনাম—‘নির্বিচারে পুলিশ হত্যা’। এই লেখায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের লাশঘর থেকে সুইপাররা দুই ট্রাক লাশ তোলেন, যার অধিকাংশই ছিল সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, আনসার ও পাওয়ারম্যানদের খাকি পোশাক পরা বিকৃত লাশ। পচা, ফোলা, গুলিতে ক্ষতবিক্ষত লাশের অধিকাংশই ছিল পুলিশের খাকি শার্ট পরা।
.আপনিও যেতে পারেন
সপ্তাহের বুধবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টায় পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দরজা খোলা হয়। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এবং অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। দিনে বেলা একটা থেকে এক ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকে।






