ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার–প্রচারণা শুরু না হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে এখনো নির্বাচনী উত্তাপ ছড়ায়নি। তবে মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই শেষে সাধারণ ভোটার ও দলীয় নেতা–কর্মীরা বলছেন, তিনটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
দুটি আসনে বিএনপির প্রার্থী ঘোষণার পর একাংশের নেতা–কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রার্থী বদলের দাবিতে বিক্ষোভ–অবরোধের ঘটনাও ঘটে। মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের কেউ কেউ মনোনয়নপত্রও তুলেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কেউ প্রার্থী হননি। দলীয় প্রার্থীরা বলছেন, বর্তমানে অধিকাংশ নেতা–কর্মী তাঁদের পক্ষে কাজ করছেন।
তিনটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণ অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মোট ১৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। জাতীয় পার্টি (জাপা) দুটি আসনে ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) একটি আসনে প্রার্থী দিলেও যাচাই-বাছাইয়ে তাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। তৎপরতা নেই নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)।
বিএনপির প্রার্থী দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিঞা। ১৯৯১ সালের পর থেকে টানা চারবার তিনি এ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। এরপর একাংশের নেতা-কর্মীরা রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহিন শওকতকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন।
শাহজাহান মিঞা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দলে আমার বিরোধিতা থাকলেও কেউ মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেননি। শেষ পর্যন্ত সবাই ধানের শীষের হয়েই কাজ করবেন। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শক্তিশালী। আমিও রাত–দিন গণসংযোগ করছি।’
জামায়াত এ আসনে রাজশাহী মহানগর শাখার আমির মো. কেরামত আলীকে প্রার্থী করেছে। ২০০৯ সাল থেকে টানা দুবার তিনি শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। কেরামত আলী বলেন, ‘এখানে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে। মানুষ নতুন কিছু চায়।’
বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মনিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের নবাব মো. শামসুল হোদা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের মো. আবদুল হালিম ও জেলা জাপার সভাপতি আফজাল হোসেন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। এর মধ্যে ঋণখেলাপির জন্য আফজাল হোসেনের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়।
বিএনপির শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সহসম্পাদক আমিনুল ইসলাম এ আসনে দলীয় প্রার্থী। তিনি ২০১৮ সালে এমপি নির্বাচিত হন। ২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর বিএনপির অন্য এমপিদের সঙ্গে তিনি পদত্যাগ করেন। এবার তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার পর তিন উপজেলায় তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন একাংশের নেতা-কর্মীরা। স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র তুলেছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম (তুহিন), জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদা আফরোজ হক, বিএনপির সমর্থক সাহফুজ আলম ও কানাডাপ্রবাসী মু. ইমদাদুল হক। তাঁরা শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেননি।
আবদুস সালাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত প্রার্থী পরিবর্তন হবে, কিন্তু তা হয়নি। আমি দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। ধানের শীষের পক্ষে কাজ করব।’
আমিনুল ইসলাম তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন ও বিরোধিতাকে পাত্তা দিতে চান না। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জয়লাভে কোনো বাধা দেখি না। দলে যাঁরা বিরোধিতা করছিলেন, বেশির ভাগই লাইনে এসেছেন। এখন সব দিক দিয়েই পরিস্থিতি ভালো।’
জামায়াতের জেলার নায়েবে আমির মু. মিজানুর রহমানকে এখানে প্রার্থী করেছে দলটি। এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া মিজানুর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দুর্নীতিমুক্ত দেশ তৈরি করতে ভোটাররা জামায়াতের প্রার্থীকেই বেছে নেবেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের মো. ইব্রাহীম খলিল ও সিপিবির জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাদেকুল ইসলাম প্রার্থী হয়েছেন। জাপার মু. খুরশিদ আলম মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাইয়ে বাতিল হয়ে যায়।
জেলার তিনটি আসনের মধ্যে এ আসনে বামপন্থী দলের একমাত্র প্রার্থী সাদেকুল ইসলাম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মাঠে কোনো সমস্যা দেখছি না। এই আসন আদিবাসী-অধ্যুষিত। তাঁদের মধ্যে ভালোই সাড়া পাচ্ছি। এ ছাড়া খেতমজুর শ্রেণির লোক কাস্তে প্রতীককে নিজেদের প্রতীক মনে করছেন।’
জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি জোটে থাকাকালে এ আসনে কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি। এবার বিএনপির প্রার্থী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি হারুনুর রশীদ। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের পর ২০১৮ সালের নির্বাচনেও জয়ী হয়েছিলেন তিনি। জামায়াত সর্বশেষ ১৯৯১ সালে এখানে জয় পেয়েছিল।
হারুনুর রশীদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার পক্ষে জনসমর্থন বরাবরই ভালো ছিল। এখনো আছে। জামায়াতের লোকজন নানাভাবে প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছেন। ধর্মকে ব্যবহার করছেন। সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ভালোভাবে নেবেন না। এ আসনে বারবার সেটা প্রমাণিত হয়েছে।’
এখানে জামায়াতের প্রার্থী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম (বুলবুল)। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করে পরাজিত হন। নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলের ওই নির্বাচনকে নির্বাচন বলা যায় না। তখন পুলিশের তাড়া খেয়ে বেড়াতেন জামায়াতের নেতা-কর্মীরা। এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’
এ ছাড়া গণ অধিকার পরিষদের মো. শফিকুল ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনিরুল ইসলাম আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জেএসডির মো. ফজলুর ইসলাম খান মনোনয়নপত্র জমা দিলেও যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়ে যায়।






