রাজশাহীর শহীদ জিয়া শিশুপার্কটি তিন বছরের জন্য ইজারা নিয়েছিল স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার মালিকানাধীন ‘মেসার্স উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পার্কটির নিয়ন্ত্রণ হারান ইজারাদার মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন। এখন বিএনপি, যুবদল ও জামায়াতের তিন নেতা মিলে পার্কটি পরিচালনা করছেন।

পার্ক বেদখল হওয়ায় ১১ মার্চ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সচিবের দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন ইজারাগ্রহীতা আনোয়ার হোসেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, পার্কটি বাংলা ১৪৩১,১৪৩২ ও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের মেয়াদে ইজারাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি যথাযথভাবে পরিচালনা করছিলেন। ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট তারিখ থেকে এ পর্যন্ত পার্কটি কথিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ চক্র অবৈধভাবে দখল করে নিয়ে পরিচালনা করে আসছে। এতে তিনি আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাই তিনি তাঁকে পার্ক বুঝিয়ে দেওয়ার আবেদন জানান।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অভিযোগটি তাঁর কাছে আসেনি। এলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তবে তিনি আজ সোমবার নতুন প্রশাসকের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় ৩ বছরের জন্য পার্কটি ‘মেসার্স উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজকে’ ইজারা দেওয়া হয়। ইজারামূল্যের সঙ্গে আরও ৩৬ লাখ টাকা ভ্যাট ও আয়কর যুক্ত হয়। মোট ১০ কিস্তিতে টাকা পরিশোধের কথা। এ পর্যন্ত ৬টি কিস্তিতে ৯০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ১৪ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা জমা দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশনের নথিপত্রে এখন পর্যন্ত পার্কের বৈধ ইজারাদার ‘মেসার্স উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজ’।

২০২৪ সালের ১০ আগস্ট থেকে পার্কটির নিয়ন্ত্রণ হারান ইজারাদার আনোয়ার হোসেন। রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের এই সহসভাপতি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন থেকেই পলাতক। ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে রাজশাহীতে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।

বর্তমানে পার্কটি পরিচালনা করছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা ও রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি শাকিলুর রহমান, শাহ মখদুম থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাসিম খান এবং মহানগর যুবদলের সদস্য আরিফুজ্জামান সোহেল। তাঁদের মধ্যে শাকিলুর রহমানকে গত বছরের ২৭ মার্চ এক ইফতার মাহফিলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ঘোষণা করে জামায়াত।

শাকিলুর রহমান ৫ আগস্ট–পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময় ওই পার্কে অবস্থানের ছবি ও ভিডিও নিজের ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। পার্কের সংস্কারকাজ করছেন বলে সেসব পোস্টে জানিয়েছেন তিনি। কখনো কখনো তাঁর সঙ্গে পার্কে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদেরও দেখা গেছে। অভিযোগ আছে, পার্কের আয়ের একটি অংশের ভাগ করপোরেশনের কর্মকর্তারাও পেয়েছেন।

গতকাল রোববার সকালে পার্কে গিয়ে দেখা যায়, বাস, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের পার্কিংয়ের জন্য স্লিপ দিয়ে টাকা নিচ্ছেন হাসিবুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। বাসের জন্য ১৫০ টাকা, মোটরসাইকেল ২০ টাকা ও মাইক্রোবাসের জন্য ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। পার্কে জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা। হাসিবুল জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে শাকিলুর রহমান, নাসিম খান ও আরিফুজ্জামান সোহেল পার্কটি পরিচালনা করছেন।

পার্কের ব্যবস্থাপক নাজমুল মুজাহিদ হোসেন নিজেকে ইজারা নেওয়া প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজের’ ব্যবস্থাপক পরিচয় দেন। তিনিও একই কথা বলেন। পার্ক দখলের অভিযোগের বিষয়ে মহানগর যুবদলের সদস্য আরিফুজ্জামান সোহেল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তিনি ঢাকায় আছেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব প্রমাণপত্র শাকিলের কাছে আছে। তিনি শাকিলের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

শাহ মখদুম থানা বিএনপির সদস্যসচিব নাসিম খান মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি ঢাকায় আছি। আগের ইজারাদার আওয়ামী লীগের দোসর, খুনি। আমরা তাঁর কাছ থেকে অ্যাফিডেভিট করে নিয়েছি।’ ইজারাদার মালিকানা হস্তান্তর করতে পারেন না, করলে আইনানুযায়ী ইজারা বাতিল হয়ে যায় জানালে তিনি বলেন, ‘আমরা টেকনিক্যালি ওটা করেছি। আপনারা বোঝেন তো। আমি ঢাকা থেকে ফিরলে আসেন। সামনাসামনি সব বুঝিয়ে দেওয়া যাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যাঁরা পার্ক দখল করে পরিচালনা করছেন, তাঁরা মূল ইজারাদারের কাছ থেকে হস্তান্তর নিয়েছেন মর্মে একটি অ্যাফিডেভিট তৈরি করেছেন। এতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের নাম ‘উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজ’ হলেও অ্যাফিডেভিটে লেখা ‘উম্মে রোমন এন্টারপ্রাইজ।’ অ্যাফিডেভিটেও ‘উম্মে রোমান এন্টারপ্রাইজের’ প্রোপ্রাইটরের স্বাক্ষর আছে। তবে সিটি করপোরেশনে আনোয়ার হোসেন যে অভিযোগ দিয়েছেন, সেই অভিযোগপত্রের সঙ্গে অ্যাফিডেভিটে থাকা স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই। দুটি স্বাক্ষর দুই রকম।

অ্যাফিডেভিটে সাক্ষী হিসেবে মো. জাকারিয়া হোসেন ও মো. সোহেল আহসান নামের দুজনের স্বাক্ষর ও মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। জাকারিয়া হোসেনকে ফোন করলে তিনি অ্যাফিডেভিটে স্বাক্ষরের বিষয়টি মনে করতে পারেননি।

এসব বিষয়ে জামায়াত নেতা শাকিলুর রহমান মুক্তকণ্ঠের কাছে দাবি করেন, ‘আমরা নিয়মানুযায়ী ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে মূল ইজারাদারের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছি।’ অ্যাফিডেভিটে ইজারাদারের স্বাক্ষরের অমিলের বিষয়ে বলেন, ‘একজনের তিন রকম স্বাক্ষর থাকতে পারে। আমি নিজেই তিন রকম স্বাক্ষর ব্যবহার করি।’ অ্যাফিডেভিটের সাক্ষীরাও স্বাক্ষর করার কথা মনে করতে পারছেন না জানালে বলেন, ‘সাংবাদিকের ফোন পেলে অনেকেই ভয় পায়। সে জন্য হয়তো মনে নেই বলতে পারে।’

শাকিলুর রহমান বলেন, ‘পার্কটির রাইডগুলো সব নষ্ট ছিল। দায়িত্ব পাওয়ার পরে আমি ৫৫ লাখ টাকা খরচ করে ঠিক করেছি। সবই শিশুদের একটা পরিবেশ দেওয়ার স্বার্থে করেছি। এখান থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের একটা টাকাও মুনাফা হয়নি। আমরা ছেড়ে দিতে পারলে বাঁচি।’

যোগাযোগ করলে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শাকিল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সভাপতি ছিলেন, সে-ও অনেক আগের কথা। এখন তিনি জামায়াতের সমর্থক। তাঁরা জানেন যে পার্ক তিনি অন্য কারও কাছ থেকে ইজারা নিয়েছেন। এখানে দলের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

এ বিষয়ে ইজারাগ্রহীতা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আনোয়ার হোসেন পলাতক থাকায় তাঁর সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সিটি করপোরেশনের এস্টেট অফিসার আবু নূর মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘আমাদের এখানে এখনো বৈধ ইজারাদার আনোয়ার হোসেন। পার্ক দখলের ব্যাপারে তিনি কয় দিন আগে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জেনেছি। করপোরেশনের প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিবের দপ্তর হয়ে অভিযোগটি আমার কাছে আসবে। তারপর আমরা সরেজমিন দেখে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’ তিনি বলেন, ‘পার্ক কাউকে সাব-লিজ দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। সেটি করলে ইজারা বাতিল হয়ে যাবে। কারণ, পার্ক পরিচালনার অভিজ্ঞতাসহ বেশ কিছু শর্তেই ইজারা দেওয়া হয়।’