রাজধানীর মিরপুরের কালশীর বাউনিয়া বাঁধ সি–ব্লকের আনন্দ নিকেতন স্কুল। ঘড়ির কাঁটায় বেলা দুইটা। স্কুলের গেট দিয়ে একে একে প্রবেশ করতে শুরু করে শিশুরা, হাতে হলুদ রঙের কুপন। সঙ্গে অভিভাবকেরাও আসেন। মাঠে সারিবদ্ধভাবে সাজানো চেয়ারগুলোয় এসে বসে যান। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয়ে যায় চেয়ারগুলো। শিশুদের চোখেমুখে অপেক্ষা আর উচ্ছ্বাস—কিছুক্ষণ পরই যে হাতে পাবে ঈদের নতুন পোশাক।
এর মধ্যেই সঞ্চালক আশফাকুর রহমান হাতে মাইক নিয়ে কয়েকজন শিশুকে সামনে ডেকে আনেন। স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে আবু তাহের (১২)। মাথায় টুপি, আর গায়ে পাঞ্জাবি পরে একাই এসেছে বন্ধুসভার ঈদের উপহার নিতে। সে বলে, ‘ঈদের সময় নতুন কাপড় পেলে খুব আনন্দ লাগে। নতুন জামা দেওয়ায় বন্ধুসভাকে অনেক ধন্যবাদ।’
১০ বছর বয়সী কাকলি আক্তার স্থানীয় একটি স্কুলে পড়ে। স্কুলের পাশের বস্তিতে থাকে। বাবা একটি ভাঙারির দোকানে কাজ করেন। সে বলে, ‘ঈদের জন্য নতুন জামা পাব, ভাবিনি। আজ এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। এই জামা পরে ঈদের দিন ঘুরব।’
আরেক ছেলে ১২ বছর বয়সী শাফায়াতুল ইসলাম। তবে সে পড়াশোনা করে না। জিজ্ঞাসা করলে জানায়, একটি দোকানে র্যাপিংয়ের কাজ করে। অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারে না। কাজ করে যে টাকা পায়, সেটা মায়ের হাতে তুলে দেয়।
প্রথম ধাপে আজ শনিবার আনন্দ নিকেতন স্কুলে এমন ১৭০ সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়ে আসে মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভার ঈদের উপহার নিতে। বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের উদ্যোগে ‘সহমর্মিতার ঈদ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এদিন শিশুদের নতুন পোশাক ও তাদের পরিবারের জন্য ঈদের খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হয়। প্রতিটি পরিবারের জন্য খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল সয়াবিন তেল, পোলাওয়ের চাল, পেঁয়াজ, আলু, চিনি, লাচ্ছা সেমাই, দেশি সেমাই ও গরমমসলা।
এ সময় শিশু ও অভিভাবকদের উদ্দেশে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক বলেন, ‘আমরা যে কাজটা করি, আমাদের এই কাজ দেখে বাংলাদেশের আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হয়। সারা দেশে আমাদের ১৪৬টি ইউনিট আছে, সবাই প্রতি ঈদে এ কাজটি করে। দেশজুড়ে বন্ধুসভার সদস্যরা নিজেদের অর্থায়নে ঈদের কেনাকাটা করে আপনাদের উপহার দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিবেশীর হক আদায় করে।’
সহসভাপতি রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী বলেন, ‘এই যে ঈদের উপহারগুলো দেখছেন, এগুলো আমরা বন্ধুসভার বন্ধুরা নিজেদের ঈদের কেনাকাটার অর্থ থেকে কিছুটা বাঁচিয়ে আপনাদের জন্য নিয়ে আসে। উদ্দেশ্য, ঈদের আনন্দ আপনাদের সঙ্গেও ভাগ করে নেওয়া। মুক্তকণ্ঠের একটা স্লোগান আছে—“যা কিছু ভালো, তার সঙ্গে মুক্তকণ্ঠ।” আমরা চেষ্টা করি এ ধরনের ভালো কাজগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার।’
সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে অভিভাবকদের উদ্দেশে জাতীয় পর্ষদের সহসভাপতি নূর–ই আলম বলেন, ‘আপনাদের মধ্যে যাঁদের সন্তান স্কুলে যায় না, তাদের স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। একটু কষ্ট হলেও বাচ্চাদের পড়াশোনা চালিয়ে নেবেন। আমরা সব সময় আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’
কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপে আগামী মঙ্গলবার গাবতলীর মাজার রোড এলাকায় ব্যাস নেটওয়ার্কের সৌজন্যে ৭৫ শিশুকে নতুন পোশাক ও তাদের পরিবারের জন্য খাদ্যসামগ্রী উপহার দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে মোহাম্মদপুরে জহুরী মহল্লায় শিশুদের একটি দিবাযত্ন কেন্দ্রে আরও ৬০ শিশুকে নতুন পোশাক ও তাদের পরিবারকে খাদ্যসামগ্রী উপহার দেবে জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ।
কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পর্ষদের উপদেষ্টা আশিকুজ্জামান অভি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বুশরা, অর্থ সম্পাদক শাকিব হাসান, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আশফাকুর রহমান ও বন্ধুসভার ডিজিটাল কনটেন্ট সহযোগী তাহসিন আহমেদ।






