দেশে জিরা চাষের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে বারি জিরা-১। জিরা চাষের জন্য এবার মসলা গবেষণাকেন্দ্র থেকে ১০০ জন চাষিকে এ জাতের বীজ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৯০ জনের খেতে জিরা হয়েছে। খেত নষ্ট হয়েছে শুধু ১০ জনের। জিরার ফলনে এগিয়ে আছে বরেন্দ্র অঞ্চল। তাদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীন পরিচালিত দেশের মসলা গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান কার্যালয় বগুড়ার শিবগঞ্জে। ওই কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াদুদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রাজশাহী, ফরিদপুর, মাগুরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন এলাকায় এবার জিরা চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাটি ও আবহাওয়া জিরা চাষের জন্য উপযোগী। এখানে ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
মসলা গবেষণাকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ১২ বছর গবেষণার পর ২০২২ সালে বারি জিরা-১ জাতটি অবমুক্ত করে মসলা গবেষণাকেন্দ্র। এ জাতের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা ৯০ শতাংশের বেশি। ওই বছর থেকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের (প্রথম সংশোধিত)’ মাধ্যমে বীজ কিনে চাষিদের মধ্যে প্রণোদনা হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে। চলতি বছর ১০০ জন চাষিকে আধা কেজি করে বীজ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১০ জনের মাঠ নষ্ট হয়েছে। বাকিরা জিরা চাষ করেছেন। আধা কেজি বীজে প্রায় ১৭ শতাংশ জমিতে জিরা চাষ করা যায়।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ১১ জন চাষি এবার জিরা চাষ করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁদের জিরা পাকতে শুরু করেছে। হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে ওই চাষিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন মসলা গবেষণাকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন, জিরার গাছের রং যখন ধানের খড়ের মতো হবে এবং হাত দিয়ে জিরা দানায় টিপ দিলে দুই ভাগ হয়ে যাবে, তখন বুঝতে হবে জিরা পেকেছে। ইতিমধ্যে কয়েকজন চাষি তাঁদের মাঠের জিরা তুলতে শুরু করেছেন।
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল ওয়াদুদ জানান, গোদাগাড়ীর গোলাই গ্রামের চাষি জিয়ারুল ইসলাম গত বছরও জিরা চাষ করেছিলেন। তাঁর জিরা সবচেয়ে উন্নতমানের হয়েছিল। মসলা গবেষণাকেন্দ্র তাঁর সব জিরা বীজ হিসেবে কিনে নিয়েছিল। সেই বীজ চাষিদের মধ্যে এবারের মৌসুমে বিতরণ করা হয়েছে। তাঁর বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা গবেষণাকেন্দ্রের হারের চেয়ে মাত্র ৫ শতাংশ কম।
সম্প্রতি গোদাগাড়ীর চাষিদের খেত দেখতে গিয়ে মাঠেই পাওয়া গেল উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকারকে। তিনিই চাষিদের জিরা চাষে উদ্বুদ্ধ করছেন। গোলাই গ্রামের চাষি জিয়ারুল ইসলাম বললেন, ‘অতনু দাদার উৎসাহে নতুন এই ফসল চাষ করেছেন। গত বছর ১০ কাঠা জমিতে জিরা চাষ করেছিলাম। এবারও সেই জমিতেই চাষ করেছি।’
জিয়ারুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, খেত থেকে তুলে এনে বাড়ির ছাদের ওপর জিরার গাছ শুকাতে দিয়েছেন তিনি। জিরা মাড়াই করা যাবে কি না পরীক্ষা করে দেখছিলেন। পরে ফোন করে জিয়ারুল জানান, এবার তাঁর জমিতে ৩০ কেজি জিরা হয়েছে। গবেষণাকেন্দ্রের লক্ষ্যমাত্রা এক শতাংশ জমিতে দুই থেকে আড়াই কেজি জিরা হবে, সেই হিসাবে জিয়ারুল সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁর ফলন হয়েছে শতাংশে তিন কেজি করে।
জিয়ারুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গত বছর বীজ ছিটিয়ে চাষ করেছিলেন। এবার চারা রোপণ করায় গাছ ভালো হয়েছিল। নভেম্বরের শুরুতে রোপণ করতে হয়। মাত্র ১১০ দিনের ফসল। এতে তাঁর খরচ হয়েছে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। গতবার মসলা গবেষণাকেন্দ্র এক হাজার টাকা কেজি হিসাবে তাঁর জিরা বীজ হিসেবে কিনে নিয়েছিল। তবে বাইরে এই বীজ তিনি ২ হাজার টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি করেছিলেন। এটা লাভজনক ফসল। তিনি আগামী মৌসুমে দেড় বিঘা জমিতে জিরা চাষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান।
একই গ্রামের আলী আজগর এবার সাড়ে ১৬ শতাংশ জমিতে জিরা চাষ করেছেন। ৩ মার্চ তাঁর জমিতে গিয়ে দেখা যায়, জিরা পাকতে আরও কয়েক দিন লাগবে। তাঁর মাঠ খুবই সুন্দর হয়েছে। পরে ১১ মার্চ মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে আলী আজগর বলেন, মাঠ থেকে জিরা তুলে রোদে শুকাতে দিয়েছেন। এখনো মাড়াই করা হয়নি। আশা করছেন অন্যদের চেয়ে তাঁর ফলন ভালো হবে।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার তারাইল গ্রামের চাষি অমিত কুমার দাস ১০ শতাংশ জমিতে এই জিরা চাষ করা হয়েছে। তাঁর জমিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রদর্শনী প্লট করেছে।
রাজশাহীর সঙ্গে তুলনা করার জন্য ভাঙ্গার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিল্লুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, অমিত দাসের জিরা এখনো পাকেনি। আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। তবে ফলন ভালো হবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
পাবনার সুজানগর উপজেলার কামারদুলিয়া গ্রামের চাষি আসলাম উদ্দিন জিরাখেতকেও প্রদর্শনী প্লট করা হয়েছে। যোগাযোগ করলে সুজানগরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গত ১০ মার্চ জিরা ওঠানো হয়েছে। এখনো মাড়াই করা হয়নি। তবে জিরা আরও আগাম লাগানো দরকার ছিল। কড়া রোদের কারণে ফুল কিছুটা শুকিয়ে গেছে।